অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে হেনস্তার প্রতিবাদে হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে তাঁরা

প্রতিবাদ জানাতে হাফপ্যান্ট পরে মেট্রো স্টেশনে এসেছেন তিন তরুণ। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনেছবি: সাজিদ হোসেন

হাফপ্যান্টকে ‘অশালীন’ বলে একজন অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে মেট্রো স্টেশনে পুলিশের হেনস্তার প্রতিবাদে হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে চড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন কয়েকজন তরুণ।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাতটার দিকে ঢাকার ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে হাফপ্যান্ট পরে প্রতিবাদ জানান পাঁচ তরুণ। এই স্টেশনেই গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে টি-শার্ট ও হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠতে যাওয়ায় সাজ্জাদ হোসেন নামের এক অ্যাথলেট প্রশিক্ষক পুলিশের হেনস্তার মুখে পড়েন।

সাজ্জাদ হোসেনকে হেনস্তার প্রতিবাদে আজ সকালে (ভোর পাঁচটা থেকে সকাল আটটা) ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে ‘হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে!’ শীর্ষক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। স্বাভাবিক স্পোর্টসওয়্যার পরার কারণে কাউকে হয়রানি করা বা গণপরিবহন ব্যবহারে বাধা দেওয়া উচিত নয় বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁদের এই কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ‘হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে!’ শিরোনামে আয়োজকদের খোলা একটি ফেসবুক ইভেন্টে গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৬৭২ জন ‘গোয়িং’ (যাচ্ছি) ও ৮ হাজার ২০০ জন ব্যবহারকারী ‘ইন্টারেস্টেড’ (আগ্রহী) দিয়েছিলেন।

এই কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশে সকাল পৌনে সাতটায় ফার্মগেটে খামারবাড়ি-সংলগ্ন মেট্রো স্টেশনের নিচে যান এই প্রতিবেদক। তখন পুলিশের একটি দল মেট্রো স্টেশনের নিচে অবস্থান করছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের একটি প্রাইভেট কারও দেখা গেল সেখানে। পাশেই অপেক্ষমাণ ছিলেন দু-একজন সাংবাদিক। কিন্তু কর্মসূচি আহ্বান করা অ্যাথলেটদের কাউকে সেখানে দেখা যায়নি।

হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠছেন তাঁরা। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে
ছবি: সাজিদ হোসেন

সকাল সাতটার দিকে তিনজন তরুণ ফার্মগেটে আনোয়ারা উদ্যান-সংলগ্ন মেট্রো স্টেশনের নিচে আসেন। তাঁরা হলেন বেসরকারি চাকরিজীবী সাগর মজুমদার ও রকিবুল ইসলাম এবং ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান। জানতে চাইলে রানার ও বেসরকারি চাকরিজীবী সাগর মজুমদার প্রথম আলোকে বললেন, ‘আমরা রানার। দৌড়ানোর সময় শর্টস পরাটা বেশি কমফোর্টেবল। সে জন্য আমরা শর্টস পরি। দেশ-বিদেশে পরিচিত অ্যাথলেট সাজ্জাদ হোসেন সম্প্রতি শর্টস পরে মেট্রোতে উঠতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন। আমরা চাই না আর কেউ তাঁর মতো হয়রানির শিকার হোক। সে জন্যই প্রতিবাদ জানাতে আসা।’

সাগর মজুমদার বলেন, যেহেতু তিনি একজন রানার, ফলে তিনিও সাজ্জাদ হোসেনের মতো হয়রানির শিকার হতে পারেন মেট্রোরেল বা অন্য যেকোনো জায়গায়। সেই জায়গা থেকে একটি কর্মসূচি ডাকা হয়েছে। সেখানে যোগ দিতে তিনি এসেছেন। সবার প্রতি তাঁদের বার্তা হচ্ছে, ‘আসুন, আমরা নেগেটিভ মাইন্ডটাকে (নেতিবাচক মন) সরিয়ে ফেলি। শর্টস আসলে বিষয় নয়, নেতিবাচকভাবে দেখলে নেতিবাচক আর ইতিবাচকভাবে দেখলে ইতিবাচক।’

এই কর্মসূচিতে তাঁরা তিনজন ছাড়া অন্য কেউ এলেন না কেন, সেই প্রশ্নে ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান বলেন, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবাদ জানাতে এসেছেন। অন্যদের বিষয়টি তাঁদের জানা নেই। মাহফুজুর বলেন, ‘মেট্রোতে হাফপ্যান্ট পরে আসার অধিকারটা থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। এটা একটা স্বাভাবিক পোশাক। আমি সাধারণত মেট্রোতে উঠি না, শর্টসও পরি না। সম্ভবত পাঁচ বছর পর আজকে একটা শর্টস খুঁজে বের করে পরে এখানে এসেছি শুধু অধিকারের কথা বলার জন্য।’

সকাল সাতটার পর ‘শর্টস’ পরে মেট্রোরেলে ওঠেন সাগর মজুমদার ও মাহফুজুর রহমান। রকিবুল তাঁদের সঙ্গে ওঠেননি। মেট্রোরেলে উঠে টিকিট কাউন্টারে গিয়ে বিজয় সরণি স্টেশনের জন্য টিকিট কাটেন সাগর ও মাহফুজুর। এরপর প্ল্যাটফর্মে ওঠার উদ্দেশ্যে টিকিট পাঞ্চ করে তাঁরা মেট্রোরেলের ভেতরের অংশে প্রবেশ করেন। পরে মেট্রোরেলে ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণি স্টেশনে নেমে নিজেদের মতো চলে যান সাগর ও মাহফুজুর।

সাগর ও মাহফুজুর যখন মেট্রোরেলে ওঠেন, একই সময়ে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের অন্য একটি ফটক দিয়ে আরও দুজন প্রতিবাদী তরুণ হাফপ্যান্ট পরে ওঠেন বলে জানা গেছে। তবে ওই দুজনের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। তাঁরা ফার্মগেট স্টেশন থেকে মতিঝিলের টিকিট কেটেছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

মেট্রোরেলে ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণি স্টেশনে নেমে চলে যান দুজন। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে
ছবি: সাজিদ হোসেন

গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে শরীরচর্চা শেষ করে টি-শার্ট ও হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠতে যাওয়ায় অ্যাথলেট প্রশিক্ষক সাজ্জাদ হোসেনের পোশাককে ‘অশালীন’ বলে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য তাঁকে টিকিট পাঞ্চ মেশিনের সামনে ৪০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখেন। যদিও মেট্রোরেলে চলাচলের জন্য কোনো ড্রেসকোড নেই। এর প্রতিবাদে ফার্মগেট স্টেশনে কর্মসূচির জন্য খোলা ফেসবুক ইভেন্টে লেখা হয়েছিল, ‘আপনার রানিং শর্টস পরুন, টি-শার্ট পরুন, একসঙ্গে আসুন, মেট্রোতে উঠুন৷ এটি কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরির আয়োজন নয়। এটি একটি শান্তিপূর্ণ নাগরিক প্রতিবাদ— স্বেচ্ছাচারী হয়রানির বিরুদ্ধে, স্পষ্ট নিয়মের দাবিতে এবং যাত্রীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণের পক্ষে। কোনো কিছু নিষিদ্ধ হলে তার স্পষ্ট ও লিখিত নিয়ম থাকা উচিত। সমস্যা শর্টসে নয়, সমস্যা হয়রানিতে!’

আরও পড়ুন