ময়লা টানেন তাঁরা, পকেট ভরেন নেতারা
কারও বেতন মাসে ১০ হাজার, কেউ পান ১৭ হাজার টাকা। আবার কারও বেতন নেই, শুধু ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে চলতে হয় তাঁদের।
বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁর উচ্ছিষ্ট পচা–বাসি খাবার, ভাঙা প্লাস্টিক, বোতল, বস্তা আর নোংরা পলিথিনে যেন উপচে পড়ছে রিকশা ভ্যানটি। সেই ভ্যান শরীরের সবটা শক্তি দিয়ে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দুজন—একজন তরুণ, আরেকজন কিশোর। ভ্যান থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে আশপাশের পথচারীরা তাঁদের পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের থামার সুযোগ নেই। যত কষ্টই হোক, ভ্যানভর্তি ময়লা পৌঁছাতে হবে নির্ধারিত জায়গায় (অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র বা এসটিএস)।
গত শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর পান্থকুঞ্জ পার্কের পাশের সড়কে কথা হয় ওই দুজনের সঙ্গে। ভ্যানচালকের নাম রুবেল। আর তাঁর সঙ্গে থাকা কিশোর সহযোগীর নাম সাইদুর। দুজনে মিলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকটি সড়কের আশপাশের বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁ থেকে ময়লা সংগ্রহ করেন।
রুবেল ও সাইদুরের কাজ শুরু হয় প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে। কাজ শেষ করতে করতে বাজে বিকেল ৪টা–৫টা। ময়লা সংগ্রহের যে প্রতিষ্ঠানে (ভ্যান সার্ভিস নামে পরিচিত) রুবেল কাজ করেন, সেখান থেকে মাসে বেতন পান ১৩ হাজার টাকা। আর সাইদুর বেতন পায় ১০ হাজার টাকা।
ময়লার কামে ম্যালা কষ্ট...দিনে ৯–১০ ঘণ্টা রাস্তায় কাটাই। মাস শেষে যে টেকা পাই, সেইডাতে পোষায় না। থাকন আর খাওনেই ম্যালা খরচা। কিন্তু কাম না করলে খামু কী?রুবেল, ভ্যানচালক
রুবেল মা ও ভাইকে নিয়ে থাকেন কাঁঠালবাগান এলাকায়। এক কক্ষের যে বাসায় থাকেন তাঁরা, এর ভাড়া মাসে আট হাজার টাকা।
কথায়–কথায় রুবেল জানান, সংগ্রহ করা ময়লার মধ্যে পাওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, কাগজ, কাচ ও বিভিন্ন ধরনের ধাতব পণ্য আলাদা করে বিক্রি করেন। এসব পণ্য (ভাঙারি) বিক্রি করে মাসে আরও ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আসে। সেই টাকা তিনি আর সাইদুর ভাগ করে নেন।
রুবেল বলেন, ‘ময়লার কামে ম্যালা কষ্ট...দিনে ৯–১০ ঘণ্টা রাস্তায় কাটাই। মাস শেষে যে টেকা পাই, সেইডাতে পোষায় না। থাকন আর খাওনেই ম্যালা খরচা। কিন্তু কাম না করলে খামু কী?’
ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি কেজি ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে তাঁরা পান ২২ টাকা। একটি ভ্যান থেকে দিনে প্রায় ১০ কেজির মতো বিক্রিযোগ্য ভাঙারি পণ্য পাওয়া যায়।
রুবেল-সাইদুরের মতো আরও অনেক তরুণ–কিশোর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজ করেন। বেশির ভাগ এলাকায় এ কাজটি ভ্যান ঠেলে ঠেলে করতে হয়। এ কাজ যাঁরা করেন, তাঁরা ভ্যান সার্ভিস কর্মী নামে পরিচিত। তাঁদের কাজ বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে তা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত এসটিএসে নিয়ে যাওয়া। সেখান থেকে ময়লা-আবর্জনা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ল্যান্ডফিলে (ময়লা ফেলার কেন্দ্রীয় ভাগাড়) নেওয়া হয়।
দক্ষিণ সিটির অন্য ওয়ার্ডগুলোতেও ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের বেতন মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে বাড়তি কিছু টাকা পান তাঁরা।
ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি কেজি ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে তাঁরা পান ২২ টাকা। একটি ভ্যান থেকে দিনে প্রায় ১০ কেজির মতো বিক্রিযোগ্য ভাঙারি পণ্য পাওয়া যায়।
বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ করা ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো এসব শর্ত ঠিকমতো মানছে কি না, তা সেভাবে তদারক করা হয় না। এটি অস্বীকার করে লাভ নেই। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে ভবিষ্যতে যাতে এসব শর্ত মানতে বাধ্য হয় ভ্যান সার্ভিসগুলো। আরেকটা বিষয়, সিটি করপোরেশন থেকেও একবার ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের মাস্ক ও গামবুট দিয়েছিল; কিন্তু তারা ঠিকমতো ব্যবহার করেনি।ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া
সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর ময়লা সংগ্রহের কাজ করা কর্মীরা মাসে যে টাকা পান, তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে। যদিও তাঁদের ঘাম আর পরিশ্রমে মাসে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করেন যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের কিছু নেতা-কর্মী। অন্যদিকে নির্ধারিত ফির (মাসে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা) বাইরে ময়লার বিলের জন্য বাড়তি টাকা দিতে হয় নগরবাসীকে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বনানী এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ময়লার বিল নেওয়া হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। সেখানে ময়লা–বাণিজ্য থেকে মাসে আদায় হয় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অথচ যাঁদের দিয়ে বাসাবাড়ি ও হোটেল–রেস্তোরাঁর ময়লা সংগ্রহ করা হয়, তাঁদের কেউ মাসে সামান্য বেতন পান, কেউবা বেতনের পরিবর্তে শুধু ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে চলেন।
‘ময়লা-বাণিজ্য’ নিয়ে ১৩-১৫ মে প্রথম আলোয় তিন পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ১৩ মে প্রকাশিত হয় ‘ঢাকা উত্তরে চাঁদা নেওয়ার লোক পাল্টেছে, অদৃশ্য শক্তির বাধাও আছে’। পরদিন ১৪ মে প্রকাশিত হয় ক্ষমতার ‘আশীর্বাদে’ চলে ময়লা-বাণিজ্য। আর ১৫ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘আ.লীগের দেখানো “বনানী মডেল” বহাল’।
ময়লা সংগ্রহের কাজ করা কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও তেমন কোনো আলোচনা হয় না। ময়লা সংগ্রহের কাজ করা ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সিটি করপোরেশনের নির্দেশনায় বলা আছে, বর্জ্য সংগ্রহকারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি রোধে মাস্ক, হাত মোজা, গামবুট ব্যবহার করতে হবে। এই কাজে কোনো শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা যাবে না। বর্জ্য সংগ্রহের সময় ভ্যানের ওপর অবশ্যই ত্রিপল বা ঢাকনা ব্যবহার করতে হবে। তবে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশন এলাকায় এসব শর্তের কিছুই মানা হয় না।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ করা ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো এসব শর্ত ঠিকমতো মানছে কি না, তা সেভাবে তদারক করা হয় না। এটি অস্বীকার করে লাভ নেই। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে ভবিষ্যতে যাতে এসব শর্ত মানতে বাধ্য হয় ভ্যান সার্ভিসগুলো। আরেকটা বিষয়, সিটি করপোরেশন থেকেও একবার ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের মাস্ক ও গামবুট দিয়েছিল; কিন্তু তারা ঠিকমতো ব্যবহার করেনি।’
বেতন ১০-১৭ হাজার টাকা
ঢাকা দক্ষিণে ওয়ার্ড আছে ৭৫টি। প্রতিটি ওয়ার্ডে দরপত্রের মাধ্যমে একটি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে (ভ্যান সার্ভিস নামে পরিচিত) ময়লা সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছে সিটি করপোরেশন। তবে প্রতিটি ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহের কাজটি নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতা–কর্মী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এই কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও এর সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতা–কর্মী।
ঢাকা উত্তর সিটিতে ওয়ার্ড আছে ৫৪টি। এসব ওয়ার্ডের কোনোটিতেই এখন সিটি করপোরেশন অনুমোদিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে যে যার মতো করে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি করছে। যে কারণে একেক ওয়ার্ডে ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের মাসিক বেতন একেক রকম। মিরপুর, মহাখালী ও ফার্মগেট এলাকায় ভ্যান কর্মীদের মাসিক বেতন কোথাও ১০ হাজার টাকা, কোথাও ১৫–১৭ হাজার টাকা।
তবে গুলশান ও বনানী এলাকায় বেশির ভাগ ভ্যান সার্ভিসের কর্মীদের মাসিক বেতন নেই। তাঁদের চলতে হয় ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে। গুলশানের ৯১–৯২ নম্বর সড়কে ময়লা সংগ্রহের কাজ করেন একটি ভ্যান সার্ভিসের কর্মী নয়ন মিয়া। তিনি বলেন, তাঁরা পাঁচ ভাই মিলে মানুষের বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ময়লা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে চার ভাই ভ্যানচালক। আর সবার ছোট ভাই ১২ বছর বয়সী ফরিদ তাঁদের সঙ্গে থেকে ভ্যান ঠেলে এবং ভাঙারি বাছাইয়ের কাজে সাহায্য করে।
একটি ভ্যান থেকে যে পরিমাণ ভাঙারি পাওয়া যায়, তা বিক্রি করে দিনে ৬০০–৭০০ টাকা পাওয়া যায় বলে জানান ভ্যানচালক নয়ন। তিনি বলেন, তাঁর অন্য তিন ভাইও দিনে ভাঙারি বিক্রি করে এ রকমই আয় (গড়ে ৬০০-৭০০ টাকা পান প্রত্যেকে) করেন।
ত্রিশোর্ধ্ব নয়ন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেতন তো পাই না। ভাঙারি টুকাইয়া যা পাই, সেইডা দিয়াই চলতে হয়।’
একটি ভ্যান থেকে যে পরিমাণ ভাঙারি পাওয়া যায়, তা বিক্রি করে দিনে ৬০০–৭০০ টাকা পাওয়া যায় বলে জানান ভ্যানচালক নয়ন। তিনি বলেন, তাঁর অন্য তিন ভাইও দিনে ভাঙারি বিক্রি করে এ রকমই আয় (গড়ে ৬০০-৭০০ টাকা পান প্রত্যেকে) করেন।
বনানী ২৩ নম্বর সড়কে কাজ করা কাউসার, গুলশান ৮৬ নম্বর সড়কে কাজ করা মিস্টন মিয়া, ৯০ নম্বর সড়কে কাজ করা আশরাফুল ইসলাম—তাঁদেরও মাসিক বেতন নেই। ভাঙারি পণ্য বিক্রির টাকায় চলতে হয় তাঁদের। এই তিনজনের প্রত্যেকে ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে দিনে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পান।
ময়লা সংগ্রহের কাজে ভাইবোন
ঢাকা উত্তর সিটির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের আইনুসবাগ এলাকা থেকে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ করেন মোশাহিদ মিয়া ও তাঁর বড় বোন জুলেখা বেগম।
মোশাহিদ জানান, ভাইবোন মিলে একটি ভ্যান সার্ভিসের অধীন ময়লা সংগ্রহের কাজ করে মাসে বেতন পান ২৫ হাজার টাকা। দুজনের বেতনই ১২ হাজার ৫০০ টাকা করে। আগে জুলেখা তাঁর স্বামী মো. শফিকের সঙ্গে কাজ করতেন। কিন্তু শফিক এখন কাওলা বাজার এলাকায় অন্য মালিকের অধীন ময়লা সংগ্রহের কাজ করেন।
মোশাহিদ বলেন, ‘ওখানে বেতন একটু ভালো। শফিক ভাই মাসে ১৭ হাজার টাকা পান। তবে সেই বাড়তি বেতনে শর্ত আছে। ময়লার মধ্যে পাওয়া ভাঙারি পণ্য রাখতে পারেন না তাঁরা। সব জমা দিতে হয় মালিকের কাছে।’
ভাঙারি বিক্রি করে আপনারা কত পান—এমন প্রশ্নে মোশাহিদ বলেন, যে এলাকায় তাঁরা কাজ করেন, সেটি ধনী এলাকা নয়। ভাঙারি তেমন হয় না। যেটুকু পাওয়া যায়, তা বিক্রি করে দিনে ৭০–৮০ টাকার বেশি হয় না।
মোশাহিদ বলেন, যেসব এলাকায় তাঁরা কাজ করেন, সেখানকার রাস্তাঘাট খুবই খারাপ। ময়লা ভর্তি হয়ে যাওয়ার পর দুই ভাইবোন মিলেও ভ্যান ঠেলতে অনেক কষ্ট হয়।