নয়াপল্টনে স্কুলে শিশুকে নির্যাতনের ঘটনায় স্কুলের ব্যবস্থাপক রিমান্ডে

পবিত্র কুমার বড়ুয়াছবি: পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া

রাজধানীর নয়াপল্টনে একটি স্কুলে চার বছরের শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার স্কুলটির ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার বড়ুয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ আজ মঙ্গলবার তাঁর রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পবিত্র কুমার বড়ুয়া নয়াপল্টনের শারমিন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও স্কুলটির প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহানের স্বামী। এ মামলার আরেক আসামি শারমিন জাহান পলাতক আছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন থানার উপপরিদর্শক মো. নুর ইসলাম গত শুক্রবার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। ওই দিন আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে রিমান্ড শুনানির জন্য আজ দিন ধার্য করেন। আজ রিমান্ড শুনানির জন্য আসামি পবিত্র কুমার বড়ুয়াকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী রিমান্ড বাতিলের পাশাপাশি জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

শিশুটিকে ধরে রেখেছেন প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান। আর মারধর করছেন স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার
ছবি: সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেওয়া

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক রুকনুজ্জামান এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামিকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামলার ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। এই আসামিসহ পলাতক আসামির বিরুদ্ধে ঘটনা ঘটানোর পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তা যাচাই–বাছাই করে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে রিমান্ডে আনা প্রয়োজন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী সালেহ উদ্দিন রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি আদালতে বলেন, এই শিশুসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনের সিসি ফুটেজ আছে। তিনি (আসামি) নির্যাতন করে আবার ভয় দেখানোর জন্য শিশুটিকে বলেছেন, ‘বাসায় বলে দিলে মুখ সেলাই করে দেব।’ তাঁরা শিক্ষক নামের কলঙ্ক। তাঁদের শাস্তি হওয়া উচিত।

এ সময় বাদীপক্ষের আরেকজন আইনজীবী বলেন, তাঁর নাম পবিত্র কুমার, কিন্তু তিনি অপবিত্র কাজটাই করেছেন। যেহেতু মামলার সপক্ষে মেডিকেল সার্টিফিকেট আছে।

আদালতে রিমান্ড বাতিল চেয়ে শুনানি করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল রশীদ মোল্লা। তিনি আদালতে বলেন, রিমান্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ, এখানে চারটা কারণ উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তাঁরা বলছেন, অন্য আসামি গ্রেপ্তারের জন্য তাঁর রিমান্ড দরকার। অন্য আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য তাঁকে কেন রিমান্ডে নেওয়া হবে? এ ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবক তাঁর বিরুদ্ধে কোনো জিডি বা অভিযোগ করেছে কি না, তা তো তদন্ত করে আসতে হবে। বাচ্চারা একটু দুষ্টামি করে। রিমান্ডে নেওয়ার কারণ অতিরঞ্জিত। বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি। সে সুস্থ আছে।

শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, বেশ কিছু বছরে স্কুল থেকে শাসন উঠে গেছে। এতে ক্ষতিটা ছাত্রদের হয়েছে। সমাজটা ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। একসময় ছাত্রদের আদব-কায়দা ও শিক্ষা ছিল। এখন আদব-কায়দা, শিক্ষা কোনোটাই নেই। প্রয়োজনে তাঁকে (পবিত্র কুমার) জেলগেটে জিজ্ঞাসা করা হোক।

পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি আদালতে বলেন, শিশুটির ওপর স্বামী–স্ত্রী মিলে অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতন করেছেন। এ আসামি স্বভাবগত নির্যাতক। তিনি আগে চট্টগ্রামেও এ রকম ঘটনা ঘটিয়েছেন।

নয়াপল্টন এলাকার মসজিদ রোডে শারমিন একাডেমি
ছবি: প্রথম আলো

এ সময় বিচারক আসামি পবিত্র কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘আপনি তো শিক্ষক না। অ্যাডমিন অফিসার। অ্যাডমিন অফিসারের কাজ তো শাসন করা না। আপনি তাকে মেরেছেন কেন?

পবিত্র কুমার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘ও আরেক শিক্ষার্থীকে থুতু মেরেছিল। আমি শুধু বলেছি থুতু মেরো না। এমনিতে মারিনি।’

পরে আদালত পবিত্র কুমারকে বলেন, ‘আপনি মুখে স্ট্যাপলার দিয়েছেন কেন?’ আসামি এ অভিযোগও অস্বীকার করেন। এ ছাড়া স্কুলের কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড না দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পবিত্র কুমার বড়ুয়া চুপ ছিলেন। পরে আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

নির্যাতনের শিকার শিশুটির মা ২২ জানুয়ারি রাজধানীর পল্টন থানায় মামলাটি করেন। এ বছরই শারমিন একাডেমিতে নিজের চার বছরের ছেলেটিকে প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করেন তিনি। ১১ জানুয়ারি ক্লাস শুরু হয়, তার এক সপ্তাহ পর নির্যাতনের শিকার হয় তাঁর ছেলে।

আরও পড়ুন

মামলায় অভিযোগ করা হয়, ১৮ জানুয়ারি সকালে ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসেন বাদী। বেলা ১টার দিকে আনতে গিয়ে দেখেন, শারমিন জাহান শিশুটির হাত জোর করে চেপে ধরে আছেন। তাঁর স্বামী পবিত্র বড়ুয়া চেয়ারে বসে আছেন। তখন বাদী তাঁর সন্তানকে বিবর্ণ, ভীতসন্ত্রস্ত ও কান্নারত অবস্থায় দেখেন। এরপর শিশুটিকে বাসায় নিয়ে যান। বাসায় নেওয়ার পর শিশুটি বারবার কান্না করে বলছিল, ‘মা, মিস আমাকে মেরেছে, আঙ্কেল মারছে, আমি কিছু করি নাই, আমি তোমাদের বলে দিলে গলায় পাড়া দেবে এবং মুখ সেলাই করে দেবে।’

এরপর বাদী তাঁর স্বামীসহ স্কুলে গিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহ করেন। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, শারমিন জাহান শিশুটির হাত ধরে অফিসে নিয়ে যান। এ সময় শিশুটির মুখে ও গালে অনবরত আঘাত করেন। নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য শিশুটি চিৎকার করলে তার মুখে স্ট্যাপলার ঢুকিয়ে দেন পবিত্র বড়ুয়া। সোফায় চেপে ধরে মারধরও করেন।

আরও পড়ুন