কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজ ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন, জুলাইয়ে চালু

মেট্রোরেলের মতিঝিল মেট্রোস্টেশন থেকে কমলাপুর পর্যন্ত উড়ালসড়কের উপর রেলের পাত বসানোর কাজ চলছে। গত ২০ অক্টোবরছবি সংগৃহীত

রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সোহেল রানা। এবারের দুর্গাপূজার ছুটিতে ট্রেনে চড়ে গ্রামের বাড়ি মোহনগঞ্জ যাচ্ছিলেন। ফার্মগেট স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে চড়ে মতিঝিল নামেন তিনি। সেখান থেকে অটোরিকশায় ৪০ টাকা ভাড়ায় কমলাপুর রেলস্টেশনে যান। অথচ ফার্মগেট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলে ভাড়া লেগেছে ২৮ টাকা। বাড়তি খরচ, স্টেশন থেকে ওঠানামার ঝক্কি ও বাড়তি সময় ব্যয় তো আছেই।

গত বুধবার দুপুর ১২টার দিকে কথা হয় সোহেল রানার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ফার্মগেট থেকে খুব কম সময়ে মেট্রোরেলে মতিঝিল পৌঁছান। কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে সময় ও খরচ কম লাগত।

নতুন পরিকল্পনা হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হবে। আর জুলাইয়ের শুরুতে যাত্রী নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মেট্রোরেল চালু হতে পারে।

রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এর মধ্যে শুধু মতিঝিল স্টেশন দিয়ে দৈনিক প্রায় এক লাখ যাত্রী আসা–যাওয়া করেন। অর্থাৎ মতিঝিল থেকে দেশের বড় রেলস্টেশন কমলাপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। এ অবস্থায় কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে যাত্রী আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের কাজ চলমান।

ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। কোম্পানিটি কমলাপুর পর্যন্ত পথে মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক চলাচল আগামী জানুয়ারিতে শুরুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। যাত্রী নিয়ে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করার কথা ছিল এপ্রিলে।

তবে এই পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নতুন পরিকল্পনা হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হবে। আর জুলাইয়ের শুরুতে যাত্রী নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মেট্রোরেল চালু হতে পারে।

মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজ চলমান। নির্মাণ শ্রমিকেরা অস্থায়ী সিড়ি দিয়ে মেট্রোর উড়ালসড়ক থেকে নিচে নামছেন। গত ২১ অক্টোবর
ছবি প্রথম আলো
আরও পড়ুন

সরেজমিনে দেখা গেছে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশে লাইন বসানো চলছে। বৈদ্যুতিক কাজও চলমান। তবে স্টেশনের ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থাসহ আরও কিছু যন্ত্র জাপান থেকে আসতে দেরি হতে পারে। সে জন্যই কিছুটা দেরিতে চালু করতে হবে। কমলাপুর মেট্রোস্টেশনের লিফট লাগানোসহ কিছু কাজ এখনো বাকি আছে।

ডিএমটিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর গত আগস্ট পর্যন্ত মেট্রোরেলে মোট ৩১ কোটি ৩৫ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেছেন। ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন দৈনিক যাত্রীর সংখ্যা প্রতিদিনই সাড়ে চার লাখের ওপর থাকে। প্রকল্প নেওয়ার সময় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রতিদিন পাঁচ লাখ যাত্রী হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল। অর্থাৎ বর্তমান যাত্রীর সংখ্যা সেই প্রাক্কলনের কাছাকাছি। কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত অংশ চালু হলে দৈনিক যাত্রীর সংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে পৌঁছানোর প্রাক্কলন রয়েছে।

নির্মাণকাজে যুক্ত প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেট্রোরেলের লাইন বসানোর কাজ এখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ তা শেষ করতে চায় কর্তৃপক্ষ। আর বিদ্যুতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৪০ শতাংশের মতো।
আরও পড়ুন

যেসব কাজ বাকি

গত সপ্তাহে সরেজমিনে মতিঝিল–কমলাপুর মেট্রোস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের অংশে মেট্রোরেলের অস্থায়ী সিঁড়ি দিয়ে শ্রমিকেরা ওঠানামা করছেন। শ্রমিকেরা জানান, ইতিমধ্যে মেট্রোরেলের উড়ালসড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে রেললাইন বসানোর কাজ চলছে। মেট্রোরেল পুরোপুরি বিদ্যুতে চলে। দুই পাশে বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হয়েছে। এর ওপর তার টানা হবে। ট্রেনের সঙ্গে তারের সংযোগের মাধ্যমে মেট্রোরেল চলাচল করে।

কমলাপুর মেট্রোস্টেশনের নিচে বালু ও পাথর স্তূপ করে রাখা রয়েছে। শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত মনির হোসেন জানান, স্টেশনের কাজ চলার কারণে নিচের সড়ক বেহাল হয়ে আছে। তাই সড়ক মেরামতের কাজ শুরু হবে।

নির্মাণকাজে যুক্ত প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেট্রোরেলের লাইন বসানোর কাজ এখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ তা শেষ করতে চায় কর্তৃপক্ষ। আর বিদ্যুতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৪০ শতাংশের মতো। এ ছাড়া কমলাপুর মেট্রোস্টেশনে লিফট বসানো, সংকেতব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ের যন্ত্রপাতি বসানো, টাইলস লাগানো, শৌচাগার প্রস্তুত করা, পানির পাম্প বসানোসহ আরও কিছু কাজ বাকি আছে।

নির্মাণাধীন কমলাপুর মেট্রোস্টেশনের নিচের সড়কে পাথর ও বালুসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী স্তুপ করে রাখা হয়েছে। গত ২১ অক্টোবর
ছবি প্রথম আলো
আরও পড়ুন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৌশলী প্রথম আলোকে বলেন, কর্তৃপক্ষের উচ্চপর্যায় থেকে জুন–জুলাইয়ে মেট্রোরেল চালুর নির্দেশনা আছে। তবে আনুষঙ্গিক কিছু কাজ বাকি রেখেই জুলাইয়ে মেট্রো চলাচল শুরু করতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

উত্তরা থেকে কমলাপুর মেট্রোরেলের নাম এমআরটি লাইন–৬। এই প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুল ওয়াহাব প্রথম আলোকে বলেন, মতিঝিল–কমলাপুর অংশের অবকাঠামো নির্মাণকাজের সার্বিক অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ। আগামী জুনের শেষে বা জুলাইয়ের শুরুতে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন, ঠিকাদারের সঙ্গে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চুক্তি আছে। তবে তিন মাস আগেই কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এত দিন কমলাপুর রেলস্টেশন দিয়ে শুধু দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে ট্রেন চলাচল করত। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেন বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মেট্রোরেল চালু হলে বাড়তি যাত্রী পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সড়কের ওপর চাপ কমবে।
সামছুল হক, পরিবহন বিশেষজ্ঞ

যেভাবে ঢাকায় মেট্রোরেল এসেছে

ঢাকার যানজট কমাতে তৎকালীন মেট্রোরেল প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১২ সালে। নির্মাণে ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এর প্রায় ৫৯ শতাংশ জাইকার ঋণ। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু করা হয়। পরের বছরের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু করা হয়।

২০২৫ সালের জুনে মতিঝিল–কমলাপুর অংশ চালুর সিদ্ধান্ত ছিল। ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার দূরত্বের এই সম্প্রসারিত অংশে উড়ালসড়ক ও কমলাপুর স্টেশন নির্মাণকাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২৩ সালে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের ভৌত কাজ করছে থাইল্যান্ডভিত্তিক ইতাল–থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি।

মেট্রোরেলের নিচের সড়কে নির্মাণ কাজ চলায় যানজট সংকুচিত রাস্তায় যানজট তৈরি হয়। গত ২১ অক্টোবর কমলাপুর মেট্রোস্টেশন সংলগ্ন সড়কে
ছবি প্রথম আলো

অন্যদিকে ইলেকট্রো–মেকানিক্যাল কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দিতে দেরি হয়। কারণ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঠিকাদার এই কাজের জন্য ৬৫১ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে ব্যয় কমানোর জন্য ঠিকাদারকে চাপ দেয়। এরপর দর–কষাকষি করে ব্যয় ১৮৬ কোটি টাকা কমানো হয় এবং ৪৬৫ কোটি টাকায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসন অ্যান্ড ট্যুবরোকে এই কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তারাই বর্তমানে এ কাজ করছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এত দিন কমলাপুর রেলস্টেশন দিয়ে শুধু দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে ট্রেন চলাচল করত। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেন বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মেট্রোরেল চালু হলে বাড়তি যাত্রী পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সড়কের ওপর চাপ কমবে। ইতিমধ্যে মেট্রোরেলে বিনিয়োগ হয়ে গেছে, তা দ্রুত তুলে আনতে হলে যাত্রী চাহিদার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে।