মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ১ বছর
‘সন্তানের মৃত্যুর কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না, আমরা ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই’
‘সকালে সুস্থ সন্তানকে হাতে ধরে স্কুলে দিয়ে এলাম। দুপুরে ডিমভুনা আর ভাত দিয়ে টিফিন দিয়ে আসি। টিফিনটা খাইছিল কি না, তা–ও জানি না। এক দিন পরে হাসপাতাল থেকে এই সন্তানের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরি। এমনভাবে পুড়ছিল যে চেহারাটাও চেনা যাচ্ছিল না। কত বলছি, আম্মুর দিকে তাকাও, আম্মুকে একবার ডাকো। কিন্তু তাকায়নি, ডাকেনি।’
ছেলে বোরহান উদ্দিন বাপ্পিকে নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন আবেগাপ্লুত বীথি আক্তার। বোরহান রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত। গত বছরের ২১ জুলাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এই ক্যাম্পাসে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় দগ্ধ হয়েছিল বোরহান। পরের দিন ভোরে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সে মারা যায়।
আজ মঙ্গলবার এ দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো। মর্মান্তিক দিনটি সামনে রেখে এ দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত একাধিক শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা সবাই এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন চান। তাঁরা চান, আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাষ্ট্র তাঁদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিক। তবে তাঁরা ক্ষোভ–আক্ষেপ নিয়ে বললেন, এক বছরে এসবের কোনো নজির দেখতে পাননি।
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ২৮ শিক্ষার্থী, ৩ জন শিক্ষক, ৩ জন অভিভাবক, ১ জন আয়াসহ মোট ৩৫ জন নিহত হন। এ ছাড়া যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ৮০ জন। বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন ৫৭ জন।
ছোট ছেলেকে অন্য স্কুলে ভর্তি
দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাছেই তারারটেক মসজিদ এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে বোরহানকে দাফন করা হয়। সেখানে আরও কবর দেওয়া হয় একই ঘটনায় মারা যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিদ হাসান আরিয়ান ও তৃতীয় শ্রেণির ওমাইর নূর আসফিকে। এই তিন শিশুই নিকটাত্মীয়।
বীথি আক্তার বলেন, বোরহানের ছোট ভাই হজরত বেলাল উদ্দিন বিজয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির একই ক্যাম্পাসে প্লে শ্রেণিতে পড়ত। বড় ছেলে বোরহানের স্মৃতি তাড়া করে। তাই ছোট ছেলেকে অন্য স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে।
স্কুলটির ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তাহিয়া আশরাফ নাজিয়া। আরিয়ান আশরাফ নাফি ছিল তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় নাজিয়া মারা যায় ২২ জুলাই, নাফি ২৩ জুলাই। তারা ছিল আপন ভাই–বোন। বাবা আশরাফুল ইসলাম জানান, নাজিয়ার শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। নাফির শরীরের প্রায় পুরোটাই পুড়ে গিয়েছিল।
সপ্তম শ্রেণির ছাত্র নাভিদ নাওয়াজ দীপ্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে বার্ন ইনস্টিটিউটে ৯৭ দিন চিকিৎসাধীন ছিল। ভর্তির পর তাকে ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। পরে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ) ও কেবিনে চিকিৎসাধীন ছিল সে। চিকিৎসাকালে তার শরীরে ৩৬ বার অস্ত্রোপচার করা হয়। স্কিন গ্রাফটিং (শরীরের একটি অংশ থেকে ত্বক কেটে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে প্রতিস্থাপন) করা হয় আটবার। গত বছরের ২৭ অক্টোবর সে বাড়ি ফেরে। তবে তাকে এখনো নিয়মিত হাসপাতালে যেতে হয়।
‘দায় নেবে কে’
রুপি বড়ুয়া রয়া পড়ত পঞ্চম শ্রেণিতে। তাকে বার্ন ইনস্টিটিউটে তিন মাস ভর্তি থাকতে হয়েছিল। দগ্ধ হওয়ায় তার হাতের আঙুল একটার সঙ্গে আরেকটা প্রায় লেগে আছে। সে এখন মাইলস্টোনেই ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। তবে সে স্কুলে যেতে পারে না। বাসায় প্রাইভেট শিক্ষক এসে পড়ান।
রুপি বড়ুয়া ঘটনার দিন স্কুলে যেতে চাইছিল না। তার মা–বাবা তাকে জোর করে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। তাই ঘটনার পর থেকে মা–বাবার ওপর ভীষণ অভিমান তার।
শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রুপি বড়ুয়াকে। তার বড় বোন একা বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ দুর্ঘটনায় আমাদের পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেছে। বোনের পাশে থাকতে হচ্ছে বলে অনার্স শেষ করার পর আমি আর পড়াশোনা, চাকরি কিছুই করতে পারছি না। বোন একা বাথরুমেও যেতে পারে না। দুর্ঘটনার সময় মেজ বোন এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল। ও এখন পর্যন্ত কোথাও ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়নি। বোনের চিকিৎসায় খরচ তো আছেই। এসবের দায় নেবে কে?’
তদন্ত, প্রতিবেদন, রিট
দুর্ঘটনার পর গত বছরের ২৭ জুলাই ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। কমিশনকে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত, কারণ, দায়দায়িত্ব, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং ঘটনাসংশ্লিষ্ট অপরাপর বিষয় চিহ্নিত করতে বলা হয়েছিল।
ঘটনার তিন মাস পর কমিশন গত বছরের ৫ নভেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলন করে তদন্ত প্রতিবেদনের কিছু তথ্য ও কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছিলেন, তদন্ত কমিশন ১৫০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে। ১৬৮টি তথ্য উদ্ঘাটন করেছে। ৩৩টি সুপারিশ করেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্ঘটনার মূল কারণ পাইলটের উড্ডয়নত্রুটি। মাইলস্টোন স্কুলের ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদিত হয়নি। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ওই ভবনে ন্যূনতম তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা ছিল। কিন্তু ছিল মাত্র একটি। তিনটি থাকলে হতাহত আরও কমত।
কমিটির প্রধান সুপারিশ ছিল জননিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে পরিচালনা করা।
তদন্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির উত্তরা ক্যাম্পাসের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ না করে অনুমোদনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ জানানোয় নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গত ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টে একটি রিট হয়। নিহত আট ও আহত এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) রিটটি করে। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আমিরুল হক।
গত ৮ মার্চ হাইকোর্ট রুল দেন। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ ও ভুক্তভোগীদের অনুলিপি দিতে নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা রুলে জানতে চান আদালত। দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে রুলে জানতে চাওয়া হয়।
একই ঘটনায় আগে হাইকোর্টে আরেকটি রিট হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আনিসুর রহমান রায়হান ২০২৫ সালের ২২ জুলাই এ রিট করেন। রিটে রুলসহ কয়েকটি নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এ রিটে মামলায় ভুক্তভোগী পরিবারের ১১ জন সদস্য পক্ষভুক্ত হন।
কাফি আহমেদ তাইফ পড়ত পঞ্চম শ্রেণিতে। সে বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি ছিল ৭০ দিন। এখনো সে হাত মুঠ করতে পারে না। তার মুখ পুড়ে গিয়েছিল। কাফির বাবা মেরাজ আহমেদ এ রিট মামলার পক্ষভুক্তদের একজন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা হয়েছে সরকারি খরচে। তবে এ ধরনের রোগীদের খাবার ও কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। এতে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখনো ফলোআপ লাগছে। ছেলে স্কুলে যাচ্ছে, বিনা মূল্যে পড়ছে। তবে ছেলে মানসিকভাবে খুবই অসুস্থ। তার চেহারা কেন এমন হয়ে গেল, তা সে মানতে পারে না।
এই বাবার প্রশ্ন, ‘এ দুর্ঘটনার দায় কার? আহত বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ কী?’
আইনজীবী আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় বর্তমানে দুটি মামলা (রিট) হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় আছে।
গত বছরের ২৫ জুলাই বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ‘মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনা: জননিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের দায় ও করণীয়’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কারিগরিভাবে বৈধ হলেও এটি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ এরিয়ার (বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ অঞ্চল) মধ্যে পড়েছে। বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ এরিয়ায় থাকা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ জনসমাগম হয়—এমন সব প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া উচিত।
‘সুষ্ঠু বিচার চাই’
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আওতাধীন একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গত ৩ জুন এক চিঠিতে জানায়, অর্থ বিভাগ এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেক পরিবারকে এককালীন ২০ লাখ টাকা এবং আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে এককালীন ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আহত ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে এ তথ্য জানাতে স্কুল কর্তৃপক্ষকে তিনটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। অভিভাবকদের বরাতে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, ঘোষিত অনুদানের পরিমাণ বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এটি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ৩ জুনের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, অর্থ ছাড়করণের সর্বশেষ তারিখ ২০২৬ সালের ২৫ জুন। এ তারিখের মধ্যে বরাদ্দ করা অর্থ ছাড় করা না হলে তা সরকারি কোষাগারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত যাবে। পরে এই অর্থ আর ছাড় করার সুযোগ থাকবে না।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরন্ নবী প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন ছাড়া অন্যরা স্কুলে ফেরত এসেছে। যারা স্কুলে আসতে পারছে না, তাদের বাড়িতে শিক্ষক পাঠানো হচ্ছে। তারা সবাই বিনা মূল্যে পড়ছে। ফিজিওথেরাপির জন্য একটি সেন্টার ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। সেখানেও তারা বিনা মূল্যে সেবা পাচ্ছে।
দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তারের মামা সাংবাদিক লিওন মীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আহত ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের এ অর্থ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আমরা ক্ষতিপূরণ চাই না। সন্তানের মৃত্যুর কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আইনি প্রক্রিয়ায় দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো জরিমানা দেবে, আমরা তা চাই।’