আইনে সংজ্ঞা পাচ্ছে নদী, দখল কি ঠেকানো যাবে
দেশের নদী রক্ষায় এক যুগ আগে সরকার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে কমিশন গঠিত হলেও কোন ধরনের জলধারা নদী হিসেবে বিবেচিত হবে, তা নির্ধারণ করা ছিল না। প্রস্তাবিত জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইনে প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হচ্ছে নদীর সংজ্ঞা।
এ আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, যেসব জলধারা পাহাড়, হ্রদ, হিমবাহ, ছড়া কিংবা অন্য কোনো জলাধার বা জলধারা থেকে উৎপত্তি হয়ে সারা বছর বা বছরের যেকোনো সময় দুই তীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগর, মহাসাগর, হ্রদ বা অন্য কোনো জলাধার বা জলধারায় যুক্ত হয়, সেটা নদী হিসেবে সংজ্ঞায়িত হবে।
নদীবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংজ্ঞার আওতায় দেশের অনেকগুলো খালকে নদী হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ হবে। খাল খননের নামে প্রকল্প নেওয়ার সুবিধার্থে সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষে নদীকে খাল হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা ঠেকানো যাবে।
সংজ্ঞায়নটা জরুরি ছিল। আমাদের নদীর একটি তালিকা আছে। সেখানে ১ হাজার ৪১৫টি নদী পাওয়া গেছে। সেগুলোকে আমরা কিসের ভিত্তিতে নদী বলছি, এখন সেটার একটা আইনি ভিত্তি তৈরি হবে।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও নদী–গবেষক তুহিন ওয়াদুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংজ্ঞায়নটা জরুরি ছিল। আমাদের নদীর একটি তালিকা আছে। সেখানে ১ হাজার ৪১৫টি নদী পাওয়া গেছে। সেগুলোকে আমরা কিসের ভিত্তিতে নদী বলছি, এখন সেটার একটা আইনি ভিত্তি তৈরি হবে।’
তুহিন ওয়াদুদ আরও বলেন, অনেক জেলায় নদীর জায়গা জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা ব্যক্তির নামে ইজারা দিয়ে দেন। তাঁরা সরকারি নথিপত্রে সেগুলোকে খাল হিসেবে দেখান। এ সংজ্ঞার কারণে সেগুলোও এখন নদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
তদন্ত-অনুসন্ধানের দায়িত্ব কমিশনের
নদী দখল ও দূষণ বন্ধে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত একটি ‘নদী রক্ষা কমিশন’ গঠনে সরকারকে নির্দেশ দেন। সরকার ২০১৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন প্রণয়ন করে। ওই আইনের আওতায় পরের বছর (২০১৪ সালের ৫ আগস্ট) গঠিত হয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন।
বিদ্যমান আইনের তৃতীয় অধ্যায়ে থাকা কমিশনের কার্যাবলি অংশে এ কমিশনকে শুধু সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নদীকে দখলমুক্ত ও পুনর্দখল রোধে সুপারিশ, নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ–সংক্রান্ত সুপারিশ, নদীর পানি দূষণমুক্ত করার সুপারিশসহ মোট ১৩টি বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করতে পারে এ কমিশন।
প্রস্তাবিত আইনে নদীদূষণকারী ও দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা চায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। খসড়া আইনের ধারা-১৫ অনুযায়ী, কমিশন বা কমিশনের প্রতিনিধিরা দেশের সব নদী, খাল ও উপকূলে নদীর দখল, দূষণ, নাব্যতা নষ্টকারী কর্মকাণ্ড পরিদর্শন, অনুসন্ধান ও তদন্ত করার ক্ষমতার বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, যেসব জলধারা পাহাড়, হ্রদ, হিমবাহ, ছড়া কিংবা অন্য কোনো জলাধার বা জলধারা থেকে উৎপত্তি হয়ে সারা বছর বা বছরের যেকোনো সময় দুই তীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগর, মহাসাগর, হ্রদ বা অন্য কোনো জলাধার বা জলধারায় যুক্ত হয়, সেটা নদী হিসেবে সংজ্ঞায়িত হবে।
একই সঙ্গে সরকারি, বেসরকারি দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের আওতাভুক্ত সব স্থাপনা ও স্থানে প্রবেশাধিকার থাকবে কমিশন বা কমিশনের প্রতিনিধিদের। এ ছাড়া খসড়া আইনে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি নোটিশ জারি করা ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা আছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর বাধ্যবাধকতা
প্রচলিত আইনে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সুপারিশ করলেও সেগুলো মানার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। নতুন আইনের খসড়ায় একটা যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবেন। বাস্তবায়ন করতে না পারলে সেটার যুক্তিসংগত কারণ কমিশনকে জানাতে হবে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও সরকারের জ্যেষ্ঠ সচিব মকসুমুল হাকিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আন্তমন্ত্রণালয় সভা শেষে খসড়া আইনটি নিয়ে নদী–গবেষক, কর্মী ও সাধারণ মানুষের মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে দিয়েছিলাম। ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন সংগঠন ও বিশেষজ্ঞের মতামত পেয়েছি। এখন যাচাই-বাছাই হচ্ছে।’
এরপর খসড়া আইনটি মন্ত্রিপরিষদে যাবে জানিয়ে মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর সেটি যাবে আইন মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে বিল আকারে সংসদে যাবে। আমরা আইনটি যেভাবে খসড়ায় রেখেছি, সেভাবেই সবকিছু আছে।’
মকসুমুল হাকিম চৌধুরী আরও বলেন, ‘আগের আইনে দুর্বলতা ছিল। খসড়া আইনে সেসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে চাই। তাই আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
থাকছে মামলা করার ক্ষমতা
খসড়া আইনে বলা রয়েছে, নদী, খাল ও সাগরের নাব্যতা নষ্ট করলে, দখল ও দূষণ করলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। এ ছাড়া সংক্ষুব্ধ নাগরিক নদী, খাল ও সাগরের উপকূল–সংক্রান্ত অভিযোগ প্রতিকারের জন্য কমিশনে আবেদন জমা দিতে পারবেন। কমিশনের অভিযোগ নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা থাকবে।
খসড়া আইনে আরও বলা রয়েছে, দেশে নদী, খাল ও সাগরের উপকূলে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পুনর্দখল রোধ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন।
অপরাধ হবে জামিন–অযোগ্য
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সংশোধিত আইনে নদী, খাল, সাগরের উপকূলের দখল, দূষণ ও নাব্যতা নষ্ট হয়—এমন কর্মকাণ্ডকে জামিন–অযোগ্য এবং একই সঙ্গে আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এসব অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিলের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রয়োগ করা হবে। সেই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতেও বিচার করা যাবে।
খসড়া আইনে বলা রয়েছে, সরকার প্রয়োজনে এ আইনের অধীনে হওয়া অপরাধ বিচারের জন্য যেকোনো জেলায় নদী আদালত স্থাপন করতে পারবে। নদী আদালত না হওয়া পর্যন্ত প্রচলিত উপযুক্ত আদালতে এসব অপরাধের বিচার হবে।
আগের আইনে দুর্বলতা ছিল। খসড়া আইনে সেসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে চাই। তাই আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি সংস্থাগুলোকে নদী, খাল ও সাগরের উপকূলে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করার আগে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অনাপত্তিপত্র নিতে হবে—এমনটা বলা রয়েছে খসড়া আইনে। নদী ও খালের পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য সংকটাপন্ন অবস্থায় উপনীত হলে কমিশন প্রস্তাবিত আইনে যেকোনো নদী ও খালকে ‘সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করতে পারবে।
আইনের যথাযথ প্রয়োগের আহ্বান
পরিবেশ সংরক্ষণ-বিষয়ক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’–এর সদস্যসচিব শরীফ জামিল প্রথম আলোকে বলেন, নদী কমিশনকে ক্ষমতায়িত করা গেলে নদীর উপকার হওয়ার কথা। তবে বাস্তবে সেটা আদৌ হবে কি না, তা নির্ভর করবে আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর।
প্রচলিত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায় জানিয়ে শরীফ জামিল বলেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সময় নদীর সীমানা যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না যায়, তাহলে নদী রক্ষা হবে না। প্রস্তাবিত আইনে যে বিধানগুলো রাখা হয়েছে, সেগুলো প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এসবের বাস্তবায়ন হবে না।