default-image

টিকা আসছে, কিন্তু এক ডোজ টিকা দেওয়ার তিন-চার সপ্তাহ পর আরেক ডোজ টিকা নিতে হবে। এই বুস্টার ডোজ ছাড়া টিকার কার্যকারিতা না-ও থাকতে পারে। কিন্তু টিকা উৎপাদনে সময় লাগছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রশ্ন উঠেছে, প্রথমে এক ডোজ করে টিকা যতজনকে সম্ভব দিয়ে দেওয়া যায় কি না। এরপর না হয় কিছু সময় লাগবে, দু-তিন মাসে যখন আরও টিকা হাতে আসবে, তখন বাকি আরেক ডোজ টিকা দেওয়া যাবে। এ কারণে খুব সমস্যা হবে কি না—প্রশ্নটি উন্নত দেশগুলোসহ সব দেশই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে। কারণ, যদি এক ডোজে মোটামুটি দু-চার মাস কাটিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে বেশিসংখ্যক মানুষকে কম সময়ে নিরাপদে রাখা যাবে। প্রশ্নটি জটিল। ৫ জানুয়ারি বিবিসি নিউজ-ফিউচারে জারিয়া গোরভেট এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন।

বেশির ভাগ রোগে বুস্টার ডোজের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের ইমিউনোলজির অধ্যাপক ড্যানি অ্যাল্টম্যান বলেছেন, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা নিখুঁতভাবে কার্যকর করে তোলার জন্যই বুস্টার ডোজের দরকার। দেখা গেছে, হাম, মাম্পস বা রুবেলার মতো ভয়াবহ রোগ প্রতিরোধে যে শিশুরা বুস্টার ডোজ নিয়েছে, তাদের ৯৬ শতাংশই পূর্ণ নিরাপদ। অন্যদিকে যারা শুধু প্রথম ডোজ টিকা নিয়ে বুস্টার ডোজ আর নেয় না, তাদের মাত্র ৬০ শতাংশ নিরাপদ। এ জন্যই মানুষ বুস্টার ডোজ নিতে বেশি আগ্রহী।

টিকা দেওয়ার পর দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা প্রথমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধরনের শ্বেত কণিকা (হোয়াইট ব্লাড সেল) সক্রিয় করে তোলে। প্রথমত প্লাজমা বি সেলকে সক্রিয় করে। কিন্তু এই সেলগুলো বেশি দিন টিকে থাকে না। ফলে যদিও টিকা নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, এরপর বুস্টার ডোজ গ্রহণ না করলে অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা দ্রুত কমে যায়। অবশ্য ভ্যাকসিনে রক্তের টি সেলও উজ্জীবিত হয়। এরা নির্দিষ্ট প্যাথোজেন চিহ্নিত করে তাকে নিষ্ক্রিয় করে। তবে বুস্টার ডোজ ছাড়া এ ধরনের টি সেল খুব বেশি থাকে না। তাই বুস্টার ডোজ নেওয়া খুব দরকার।

তাই সাধারণভাবে বলা যায়, টিকার প্রথম ডোজে কিছুটা নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে, তবে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য বুস্টার ডোজ দরকার। অবশ্য এ নিয়ে এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকের দ্বিমতও আছে।

বিজ্ঞাপন

টিকা দেওয়ার স্থান নির্বাচন

টিকা সংগ্রহ করা সহজ নয়। কিন্তু টিকা দেওয়ার ব্যবস্থাপনাও কম কঠিন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থান নির্বাচন করার কাজটি কিছুটা ধীর গতিতে চলছে। আমরা হয়তো ভাবছি, দেশে প্রতিবছর শিশুদের টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি যখন রয়েছে, তাহলে চিন্তা কী? কিন্তু করোনার টিকার ব্যবস্থাটা একটু ভিন্ন। কারণ, অল্প সময়ে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষকে টিকা দিতে হবে। টিকা গ্রহণকারীরা এলাকা ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন না, তাঁদের বিভিন্ন পেশা বা বয়স প্রভৃতি ভাগে নির্বাচিত করা হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্তত আটটি বিশাল এলাকা টিকা দেওয়ার স্থান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। শুনলে অবাক হতে হয় যে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজনি ল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টের মতো স্থানও টিকার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটা বিস্ময়কর! স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন স্মার্ট নিউজে (১৪ জানুয়ারি ২০২১) এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি স্টেডিয়ামকে টিকা দেওয়ার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যেও। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর চ্যাঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল-৪ সম্প্রতি টিকাদান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই টার্মিনাল গত বছরের মে মাস থেকে বন্ধ রাখা হয়েছিল। এখন সেটি টিকা দেওয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা নিক্কেই এশিয়ার খবরে জানা গেছে বলে স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনের নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি

কয়েক দিন ধরে দেশে করোনার সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুহার কমছে। সামান্য ওঠানামা থাকলেও মনে হয় করোনার প্রকোপ কমছে। এই ধারা অব্যাহত রাখার জন্য সবাইকে সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। মুখে মাস্ক আর কিছু সময় পরপর সাবান-পানিতে হাত ধোয়ার বিকল্প নেই। টিকার সুষ্ঠু বণ্টন এবং প্রয়োজন অনুসারে ধাপে ধাপে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থাপনা খুব জটিল ও কঠিন। কোনো বিশৃঙ্খলা যেন না হয়, সেদিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। টিকা দেওয়ার পরও সবাইকে করোনাকালের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন। তাহলেই আমরা করোনার বিভীষিকা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারব।

আব্দুল কাইয়ুম, মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক
quayum.abdul@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন