ঢাকায় চার কৌশলে ছিনতাই হচ্ছে, হিসাব নেই, বিচারও নেই
৬ মাসে একই কৌশলে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে তিন নারীর মৃত্যু।
অধিকাংশ ঘটনায় থানায় গেলে নেওয়া হয় ‘হারানো’ জিডি।
আলোচিত ২২ ঘটনার ৯টিই তেজগাঁও বিভাগের এলাকায়।
অন্তত ৮ ঘটনায় লক্ষ্য নগদ টাকা বহনকারী।
চোখের চিকিৎসা করাতে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসে ২৯ আগস্ট ভোরে ছিনতাইকারীর ব্যাগের টানে রিকশা থেকে পড়ে মারা যান শিক্ষক রনজিলা পারভিন। পাঁচ মাস আগে উত্তরায় মুক্তা আক্তার এবং জুনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সোহেলি ইসলামও একই কৌশলে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারান।
গত ছয় মাসে ঢাকায় চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টান দেওয়ার ঘটনায় এই তিন নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনটি ঘটনাতেই তাঁরা ছিলেন চলন্ত যানে আর ছিনতাইকারীরা পাশ বা পেছন থেকে ব্যাগ ধরে টেনে ফেলে দেয়।
রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের হাতে এই তিনটি মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সড়কে, মোড়ে এবং ব্যস্ত এলাকায় একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। মৃত্যু কিংবা অঙ্গহানির মতো ঘটনার বিষয়গুলো সামনে এলেও অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনা আড়ালে থাকছে। পুলিশ ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোতে দস্যুতা ও ডাকাতির মামলা নেয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৪৯টি। আর ডাকাতির মামলা মাত্র ১৮। তবে প্রকৃত ছিনতাই কতটি হচ্ছে—তার উত্তর পুলিশের মামলার হিসাব থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই মামলা করতে যায় না। আবার থানায় গেলেও মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি নেওয়া হচ্ছে।
অন্তত সাতটি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিলেন রিকশা, অটোরিকশা বা অন্য যানবাহনে। দুই ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিলেন চলন্ত ট্রেনে। দুই নারী বাসা বা গন্তব্যে পৌঁছে রিকশা থেকে নামার পরপরই আক্রান্ত হন। অর্থাৎ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সময়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে।
গত ১ মার্চ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ২২টি গুরুতর বা আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে প্রথম আলো। এই ঘটনাগুলোতে মানুষকে কুপিয়ে, ছুরিকাঘাত করে, গুলি করে, চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে এবং অস্ত্রের মুখে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ছিনতাইয়ের ২২ ঘটনার ২৬ জন সরাসরি ভুক্তভোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। এঁদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী। নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা কম হলেও তাঁদের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। ২৬ ভুক্তভোগীর ৬ জন নারী হলেও চারটি প্রাণহানির ঘটনার তিনটিই নারী।
অন্তত সাতটি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিলেন রিকশা, অটোরিকশা বা অন্য যানবাহনে। দুই ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিলেন চলন্ত ট্রেনে। দুই নারী বাসা বা গন্তব্যে পৌঁছে রিকশা থেকে নামার পরপরই আক্রান্ত হন। অর্থাৎ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সময়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে।
এমন আরও সরাসরি অভিযোগ পাওয়া যায় মোহাম্মদপুরে। ১১ মে বিকেলে চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় রিকশা থামিয়ে এক কলেজছাত্রকে ঘিরে ধরে কয়েকজন। ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তাঁর মুঠোফোন, টাকা, মানিব্যাগ ও অন্যান্য জিনিস নেওয়া হয়। পুরো ঘটনা সিসিটিভিতে ধরা পড়ে।
ছিনতাইয়ের খবর জানে না থানা
সোহেলি ইসলাম ছিলেন একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা। ঈদের ছুটি শেষে মেয়েকে নিয়ে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। ৬ জুন ভোরে বাস থেকে নেমে রিকশায় বাসায় যাওয়ার সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে টান দেয়। রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পাঁচ দিন পর হাসপাতালে মারা যান।
সোহেলির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার সময় পর্যন্ত তাঁর পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানার ওসিও তখন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তাঁরা এমন কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা জানতেন না। পরে ১৩ জুন মামলা হয় এবং একজনকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। অর্থাৎ প্রাণহানির মতো গুরুতর ঘটনাও মামলা হওয়ার আগে কয়েক দিন পুলিশের অপরাধের খাতায় ছিল না।
এমন আরও সরাসরি অভিযোগ পাওয়া যায় মোহাম্মদপুরে। ১১ মে বিকেলে চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় রিকশা থামিয়ে এক কলেজছাত্রকে ঘিরে ধরে কয়েকজন। ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তাঁর মুঠোফোন, টাকা, মানিব্যাগ ও অন্যান্য জিনিস নেওয়া হয়। পুরো ঘটনা সিসিটিভিতে ধরা পড়ে। ভুক্তভোগীর বাবা পরে গণমাধ্যমে অভিযোগ করেন, তাঁরা থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে মুঠোফোন হারানোর জিডি করতে বলে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখানেই ছিনতাইয়ের সরকারি হিসাবের বড় দুর্বলতা। একটি মুঠোফোন যদি অস্ত্রের মুখে কেড়ে নেওয়া হয়, অথচ নথিতে সেটি ‘হারানো মুঠোফোন’ হয়ে যায়, তাহলে ঘটনাটি আর ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যানে থাকে না। এ কারণে অপরাধের প্রকৃত চিত্রও বোঝা যায় না।
এর বাইরে গত ছয় মাসে ছিনতাইয়ের শিকার সাত ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের কেউই থানায় মামলা করেননি। এর মধ্যে চারজন মামলা করতে যাননি। তিনজন ছিনতাইয়ের ঘটনার পর থানায় গেলে জিডি নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি নোমান ছিদ্দিক নামে এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, ১৬ আগস্ট রাতে মৌচাক এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন। তাঁর মুঠোফোনটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। পরে রমনা থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলে মুঠোফোন হারানোর ঘটনায় জিডি নেওয়া হয়। তাতে লেখা হয়, ‘ফোনটি হারিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও সেটি পাওয়া যায়নি।’ অথচ ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখানেই ছিনতাইয়ের সরকারি হিসাবের বড় দুর্বলতা। একটি মুঠোফোন যদি অস্ত্রের মুখে কেড়ে নেওয়া হয়, অথচ নথিতে সেটি ‘হারানো মুঠোফোন’ হয়ে যায়, তাহলে ঘটনাটি আর ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যানে থাকে না। এ কারণে অপরাধের প্রকৃত চিত্রও বোঝা যায় না।
রমনা থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলে মুঠোফোন হারানোর ঘটনায় জিডি নেওয়া হয়। তাতে লেখা হয়, ‘ফোনটি হারিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও সেটি পাওয়া যায়নি।’ অথচ ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ছিনতাই শুধু রাতের অপরাধ নয়
অতীতে রাজধানীর ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো ভোর, নির্জন সড়ক, রাত কিংবা একা পথচারীদের সঙ্গে বেশি হতো। তবে গত ছয় মাসের ঘটনাগুলো সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। সকাল-রাতে ছিনতাইয়ের প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন দিনের প্রায় সব অংশেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
রনজিলা পারভিন আক্রান্ত হয়েছেন সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে। মুক্তা আক্তারের ঘটনা সকাল নয়টার পর। মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিংয়ে কলেজছাত্রকে রিকশা থামিয়ে ছিনতাই করা হয় বিকেল ৫টা ৩৭ মিনিটে। মতিঝিলে ব্যাংক ও অর্থ লেনদেনের এলাকায় দিনের বেলায় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ এসেছে।
প্রথম আলোর বিশ্লেষণ করা ২২টি ঘটনার মধ্যে ভোররাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ঘটেছে ৭টি বা প্রায় ৩২ শতাংশ। আর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ঘটেছে ৮টি বা প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু এই দুই সময়েই ঘটেছে ১৫টি ঘটনা—মোট ঘটনার প্রায় ৬৮ শতাংশ। বাকি ৭টি বা ৩২ শতাংশ ঘটেছে সকাল ৯টার পর থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে।
সকালের ঘটনাগুলোতে রিকশা-অটোরিকশার যাত্রী এবং ব্যবসার কাজে নগদ টাকা নিয়ে বের হওয়া ব্যক্তিদের লক্ষ্য করার প্রবণতা দেখা গেছে। অন্যদিকে সন্ধ্যা ও রাতের ঘটনাগুলোতে পথরোধ, ছুরি-চাপাতি দেখানো বা আঘাত করে টাকা-মুঠোফোন নেওয়ার ঘটনা বেশি।
তবে ভোরের একটি বিশেষ ঝুঁকি স্পষ্ট। ঢাকার বাইরে থেকে বাসে এসে গাবতলী, শ্যামলী, যাত্রাবাড়ী বা অন্যান্য এলাকায় নামা যাত্রীরা রিকশা বা অটোরিকশায় যাওয়ার সময় লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। যেমন সোহেলি ইসলাম ঢাকায় ফিরেছিলেন দিনাজপুর থেকে। রনজিলা এসেছিলেন বগুড়া থেকে। মোহাম্মদপুরে বাসার সামনে চাপাতির মুখে পড়া দুই নারীও ঢাকার বাইরে থেকে ঈদের ছুটি কাটিয়ে ফিরেছিলেন। অর্থাৎ বাস থেকে নামার পর টার্মিনাল থেকে বাসা পর্যন্ত যাত্রা ছিনতাইয়ের একটি স্পষ্ট ঝুঁকির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
চার কৌশল, বেশির ভাগ ঘটনায় অস্ত্র
গত ছয় মাসের ২২টি আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণে চার ধরনের কৌশল বেশি দেখা গেছে। সবচেয়ে প্রাণঘাতী কৌশলটি হলো মোটরসাইকেল, পিকআপ, সিএনজি বা অন্য গাড়ি থেকে চলন্ত রিকশা-অটোরিকশার যাত্রীর ব্যাগ ধরে টান দেওয়া। মুক্তা আক্তার, সোহেলি ইসলাম ও রনজিলা পারভিন—তিন নারীই এভাবে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে যান থেকে পড়ে মারা গেছেন। আরও তিনটি ঘটনায় এমন চিত্র দেখা গেছে।
আরেকটি কৌশল হলো দুই থেকে পাঁচজন মিলে পথচারী বা রিকশার যাত্রীকে ঘিরে ছুরি-চাপাতি দেখিয়ে বা আঘাত করে দ্রুত টাকা ও মুঠোফোন নিয়ে যাওয়া। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরে মাত্র ২৭ সেকেন্ডে দুই ব্যক্তির সর্বস্ব নিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানেও এমন কৌশল দেখা গেছে। যাত্রাবাড়ীতেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় ধরনের ঘটনায় লক্ষ্য আগে থেকেই নির্ধারিত থাকার প্রবণতা দেখা যায়। অন্তত আট ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের নগদ টাকা বহন করছিলেন। ব্যাংকারের ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, বিকাশ এজেন্টের প্রায় ৩ লাখ টাকা, মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর ১৭ হাজার ডলার, পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষকের ২ লাখ ১ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। মতিঝিলে ডলার ব্যবসায়ীকে গুলি করা হয়। উত্তরার দুই ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথেই আক্রান্ত হন।
চতুর্থ কৌশলে ভুক্তভোগীকে আটকে বা নির্জন জায়গায় নিয়ে টাকা-মুঠোফোন নেওয়ার পরও ছিনতাইকারীরা থামছে না। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা নেওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের ফোন করে আরও টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। শ্যামলী-আদাবর এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ধরে গলিতে নিয়ে তাঁর টাকা ও ফোন নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। পরে এমন একটি চক্রের নয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
২২ ঘটনার মধ্যে ১৭টিতেই অর্থাৎ প্রায় ৭৭ শতাংশে ধারালো বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার কিংবা প্রদর্শনের তথ্য পাওয়া গেছে। অস্ত্রের মধ্যে ছুরি, চাপাতি, ব্লেড, দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও পিস্তল রয়েছে। ফলে আলোচিত ঘটনাগুলোর বড় অংশ শুধু হ্যাঁচকা টানের ছিনতাই নয়; অস্ত্র দেখিয়ে ভয় সৃষ্টি করা, কুপিয়ে বা ছুরিকাঘাত করে সম্পদ নেওয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
একক ব্যক্তির চেয়ে দলবদ্ধভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি। অধিকাংশ সংঘবদ্ধ ঘটনায় দুই থেকে চারজন এবং কোনো কোনো ঘটনায় ছয়-সাতজন ছিল। ৯ আগস্ট উত্তরায় পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা নেওয়ার ঘটনায় তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়-সাতজন আসে। আরেক ঘটনায় ভুক্তভোগী নাদিমের রিকশা প্রথমে একজন থামায়, এরপর আরও তিনজন তাঁকে ঘিরে ধরে। যাত্রাবাড়ীতে মাছ ব্যবসায়ী এমেদ আলীকেও চারজন ঘিরে ধরে কুপিয়েছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি প্রথম আলোকে বলেন, ছিনতাইকারীরা সুনির্দিষ্ট সময় ও জায়গা বেছে নিচ্ছে। বিশেষ করে বাস থেকে নেমে গন্তব্যে যাওয়ার পথে যেসব জায়গা তুলনামূলক ফাঁকা, সেখানে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এসব বিবেচনায় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে বর্তমানে ৮৮টি চেকপোস্ট কাজ করছে। পাশাপাশি প্রতিটি থানায় তিন থেকে পাঁচটি নিয়মিত টহল দল রয়েছে। চেকপোস্ট ও টহলের কার্যক্রম তদারকির জন্য সুপারভিশন টিমও কাজ করছে। এরপরও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
চেকপোস্টে দায়িত্বে গাফিলতির বিষয়ে ওসমান গণি বলেন, দায়িত্বে অবহেলার তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ‘মুঠোফোন হারানোর’ জিডি হিসেবে নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কয়েকটি এলাকায় ছিনতাই বেশি
ছিনতাইপ্রবণ এলাকা ও বেশি ছিনতাই হয় এমন বেশ কিছু তালিকা করেছে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব তালিকা রাজধানীর তিন শতাধিক স্থানকে ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক এলাকায় ছিনতাই বেশি হয় বলে তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে।
তবে প্রথম আলো ২২টি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এর মধ্যে ৯টিই ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগকেন্দ্রিক। অর্থাৎ মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেরেবাংলা নগর ও তেজগাঁওয়ে ঘটনাগুলো ঘটেছে। যাত্রাবাড়ী-ডেমরা-ওয়ারী এলাকায় ৫টি, মতিঝিল-শাহজাহানপুরে ৪টি, উত্তরা-তুরাগ-বিমানবন্দর এলাকায় ৩টি এবং বনানী রেলগেট এলাকায় ১টি।
পুলিশ ছিনতাইপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করলেও ছিনতাইয়ের আতঙ্ক মানুষের পিছু ছাড়ছে না। শহরে চলাচলকারী মানুষ বলছেন, আগের তুলনায় পুলিশের তল্লাশিচৌকি অনেক কমে গেছে। কিছু জায়গায় নামমাত্র তল্লাশিচৌকি থাকলেও বেশির ভাগ সময় সেখানে পুলিশ দেখা যায় না। অনেক সময় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা সড়কের তল্লাশিচৌকি ছেড়ে মুঠোফোনে ব্যস্ত থাকছেন। এতে অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যেতে পারছে। আর মানুষের মধ্যেও ভয় বাড়ছে।
রাজধানীর গুলশানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৯ বছর ধরে কর্মরত আছেন মাহফুজা আক্তার। সপ্তাহে পাঁচ দিন কাফরুলের বাসা থেকে অফিসে যান তিনি। কাজ শেষে ফিরতে কখনো কখনো রাত নয়টা থেকে সাড়ে নয়টা বেজে যায়। প্রথম আলোকে মাহফুজা জানান, বাসা-অফিসের পথে দীর্ঘদিন তিনি রিকশায় যাতায়াত করেন। আগে কখনো তাঁর এমন ভয় হতো না। এখন সন্ধ্যা হলেই চলাচলে ভয় পান।