১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, মূল ৩ আসামি ভারতে পলাতক

  • হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরীর নাম।

  • কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বক্তব্যের কারণেই শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যা।

  • ভবিষ্যতে নতুন তথ্য এবং নতুন কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিছবি: ওসমান বিন হাদির ফেসবুক পেজ থেকে

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্ত শেষে মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ঘটনার ২৪ দিনের মাথায় গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

গতকাল বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।

ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ওসমান হাদি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন। তিনি বিভিন্ন সময় সভা-সমাবেশ, সম্প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ সংগঠনের বিগত দিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে সমালোচনামূলক জোরালো বক্তব্য দিতেন। তাঁর এ ধরনের বক্তব্যে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হন। এর জেরেই ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরীর (বাপ্পী) নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলি করেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম ওরফে মাসুদ। গুলি করার সময় ফয়সাল করিমকে বহনকারী মোটরসাইকেলটির চালক ছিলেন আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন (২৬)।

তবে এই তিনজনের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।

ব্যাটারিচালিত রিকশায় বসা শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করেন মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ব্যক্তি। ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে
ছবি: সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেওয়া

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি বেশ কিছু দিন ধরে গণসংযোগ করে আসছিলেন। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছু পর তাঁকে ঢাকার পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় ওসমান হাদি রিকশায় ছিলেন। দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে করে এসে তাঁর মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায়। ওসমান হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, এরপর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।

ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনায় দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সব মহল থেকে নিন্দা, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সরকারের পক্ষ থেকেও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়। তাঁর হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চ টানা কর্মসূচি পালন করে আসছে।

আরও পড়ুন

পলাতক ৫ আসামির কার কী ভূমিকা

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, তদন্ত ও সাক্ষ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে এবং গ্রেপ্তার আসামি ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীদের জবানবন্দি, ঘটনাস্থল ও প্রাসঙ্গিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসসমূহের ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে শহীদ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

তবে হত্যার নির্দেশদাতা, সরাসরি জড়িত দুজনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাঁদের মধ্যে মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা ঢাকার মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী (বাপ্পী)। সরাসরি গুলি করেন ফয়সাল করিম এবং তাঁর সঙ্গে ছিলেন এবং মোটরসাইকেল চালান আলমগীর হোসেন। তাঁরা পালিয়ে ভারতে চলে গেছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে বলে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম।

ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ
ছবি: ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট

পলাতক অপর দুজন হলেন ফয়সাল করিমের ভগ্নিপতি মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও ফিলিপ স্নাল (৩২)। তাঁদের মধ্যে মুক্তি মাহমুদ তাঁর বাসায় ফয়সাল ও আলমগীরকে আশ্রয় দেন ও অস্ত্র সংরক্ষণ করেন। ফয়সালসহ অন্য আসামিদের সীমান্ত পারাপারে সহায়তায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা ফিলিপ স্নাল।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দী বিনিময় চুক্তির অধীনে পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না—এ বিষয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এখন আদালতে অভিযোগ গঠনের পর ওই প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে। পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে আইনগত যেসব ব্যবস্থা আছে, তা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

ফয়সালের ভিডিও নিয়ে যা বলল ডিবি

আসামি ফয়সাল সম্প্রতি একাধিক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, তিনি বিদেশে আছেন এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলায় তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ফাঁসানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ফয়সালের ভিডিও বার্তা পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। ফয়সাল তিনটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন, সেগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়নি, এটা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এখনো আসেনি, তবে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ভিডিওগুলো ফয়সালেরই। তবে ভিডিও বার্তায় ফয়সাল দুবাই থাকার যে দাবি করছেন, সেটা সঠিক নয়। তদন্তের তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, পলাতক ফয়সাল ভারতে অবস্থান করছেন।

যেসব অভিযোগে গ্রেপ্তার ১২ জন

এই মামলায় এখন পর্যন্ত পুলিশ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২) ও সঞ্জয় চিসিম (২৩) হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ফয়সাল করিম ও আলমগীরকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

এই মামলায় প্রধান আসামি ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), বোন জেসমিন আক্তার (৪২), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪) ও শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপুকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানের শ্যালক শিপু, স্ত্রী সামিয়া ও বান্ধবী মারিয়া
ছবি: সংগৃহীত

এই পাঁচজনের বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট পরিবর্তন, অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ এবং নরসিংদীতে অস্ত্র স্থানান্তরের কাজে জড়িত ছিলেন। মা হাসি বেগম ফয়সাল ও আলমগীরকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত ছিলেন। বোন জেসমিন আক্তার ফয়সালকে তাঁর বাসায় আশ্রয় ও অস্ত্র সংরক্ষণ করে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন স্বামীকে পালিয়ে যাওয়ার খরচ বাবদ বিকাশে ৩০ হাজার টাকা পাঠান। ফয়সালের শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র ঢাকা থেকে সংগ্রহ করে নরসিংদীতে নিয়ে যান। সেই অস্ত্র ওয়াহিদের ঘনিষ্ঠ মো. ফয়সাল (২৫) নামের এক ব্যক্তির কাছে রাখেন। এই ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মো. হুমায়ুন কবির ও মা মোসা. হাসি বেগম
ছবি: র‌্যাবের সৌজন্যে

গ্রেপ্তার বাকি তিনজন সম্পর্কে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ফয়সালের বন্ধু মো. কবির (৩৩) হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি সরবরাহ করেছিল। ফয়সাল ও আলমগীরের বান্ধবী মারিয়া আক্তার ওরফে লিমা (২১) হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরীর ভগ্নিপতি আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজুকেও (৩৭) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি এই হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

ডিবি জানায়, এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে যাঁদের বিষয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তাঁদের অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে এবং নতুন কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।