সেই বাড়িতে তিন ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধার এক বোতল মদ, একটি খালি ও দুটি আংশিক খালি বোতল
গভীর রাতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার বাড়িতে অভিযান, ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার এবং বড় ধরনের মাদকবিরোধী অভিযান বলে প্রচার। গতকাল মঙ্গলবার এই অভিযানের খবরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। তবে প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধারের তালিকা নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারাই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
গত সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটা থেকে ডিবি উত্তরা বিভাগের একটি দল ভাটারার পুলিশ হাউজিং-১ আবাসিক এলাকার তিনতলা ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। ভোর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত এ অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাঁদের মধ্যে ২৬ জন নারী। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর ওই বাড়ির মালিক পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহিরকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরে মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড রিপেয়ার শাখায় কর্মরত ছিলেন জহির। পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করায় কার্যত তিনি ওএসডি অবস্থায় আছেন।
অভিযান শেষে সংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ওই বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি চলছিল। বাড়িটি থেকে বিপুল পরিমাণ মদ, গাঁজা, ইয়াবা ও ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম জব্দ করার কথা বলেছিলেন তাঁরা।
তবে ডিবির উদ্ধার তালিকায় দেখা যায়, অভিযানে ওই বাড়ি থেকে দেশীয় কোম্পানি কেরুর তৈরি হুইস্কির ৭৫০ মিলিলিটারের একটি খালি বোতল উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হয় ভারতীয় রয়্যাল স্ট্যাগ এক লিটারের একটি বোতল। ওই বোতেলে আনুমানিক ৫০০ মিলিলিটার মদ ছিল। জব্দ করা হয় স্মিরনফ ভদকার এক লিটারের একটি বোতল, যাতে ২০০ মিলিলিটারের মতো মদ ছিল। আর ভারতীয় একটি কোম্পানির হুইস্কির এক লিটারের একটি বোতল উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ওই বাড়ি থেকে একটি ইয়াবা বড়ি ও ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং একচিলতে পরিমাণ কুশ উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ডিবির জব্দ তালিকায়।
এই জব্দ তালিকা নিয়ে ডিবিরই অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তাঁরা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ওই বাড়িতে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি চলার অভিযোগের বিপরীতে উদ্ধার তালিকায় মাদকের পরিমাণ খুবই সামান্য। বিশেষ করে ৮৫ জনকে গ্রেপ্তারের মতো অভিযানের পর উদ্ধার তালিকা দেখে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।
ওই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ডিবি উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবীর। জব্দ তালিকা নিয়ে ডিবি কর্মকর্তাদের বিস্ময় প্রকাশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই বাড়িতে পার্টি আয়োজনের বিষয়ে আগে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর তাঁরা অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি করা হতো। অভিযানের আগেই আটক ব্যক্তিরা মদ ও ইয়াবা সেবন করে ফেলেন। ফলে অবশিষ্ট মাদকদ্রব্য যা পাওয়া গেছে, তা উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত বিচারে সাজা দেওয়া হয়েছে। নারীদের প্রত্যেককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও তিন দিন কারাভোগের সাজা হয়েছে। আর পুরুষদের প্রত্যেককে এক মাসের কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
ডিবি কর্মকর্তা ইলিয়াস কবীর বলেছেন, আবদুল্লাহ আল জহিরের ওই বাড়িতে ২০২৫ সাল থেকে নিয়মিত পার্টির আয়োজন করা হতো। ছয় কক্ষের বাড়িটির পাঁচটি কক্ষ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘এয়ারবিএনবি’ ও ‘ট্রাভেলা’র মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। অন্য একটি কক্ষে থাকতেন বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক। পাঁচটি কক্ষসহ পুরো বাড়িটি ১০ জনের থাকার উপযোগী করে সাজানো হয়েছিল। এক দিনের জন্য বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হতো ১৮ হাজার ৫০০ টাকায়। এর বাইরে যাঁরা পার্টিতে অংশ নিতেন, প্রত্যেককে ৬০০ টাকা করে দিতে হতো। ওই বাড়িতে মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি হতো। প্রতি মাসে লাভের ৩০ শতাংশ কমিশন পেতেন মাহবুব আলম নামের এক ব্যক্তি আর বাকি ৭০ শতাংশ পেতেন আবদুল্লাহ আল জহির।