ভোটের আগে সীমান্তের কোন ৩০ পথে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র
ঢাকায় গত ২২ জানুয়ারি দুটি বিদেশি পিস্তল, ২১টি গুলিসহ পুলিশের কাছে ধরা পড়েন মো. আজগর আলী ওরফে ভোলা (৫৫) নামের একজন অস্ত্র কারবারি। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) বলেছে, জিজ্ঞাসাবাদে আজগর জানিয়েছেন, ভারতের সীমান্ত থেকে যশোরের বেনাপোল হয়ে আসা পিস্তল দুটি বিক্রির জন্য আনা হয়েছিল।
এর আগে গত ১ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন টোল ঘর এলাকায় পুলিশ সিএনজিচালিত অটোরিকশায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, পাঁচটি গুলি, দুটি ম্যাগাজিনসহ রয়েল হাসান নামের আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। ভারত থেকে সীমান্তের মনাকষা হয়ে এ অস্ত্র ও গুলি রয়েলের কাছে এসেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ ধরা পড়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানতে পারেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতার লক্ষ্যে এসব অবৈধ অস্ত্র আনা হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কমিশনের বিনিময়ে সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র এনে এপারের অস্ত্র কারবারিদের হাতে তুলে দেন। অস্ত্র কারবারিদের হাত ঘুরে সেসব অস্ত্র পৌঁছে যায় অসাধু রাজনৈতিক নেতা, সন্ত্রাসী, উগ্রপন্থী, ডাকাত, ভূমিদস্যুসহ অপরাধীদের হাতে।
নিরাপত্তাবিশ্লেষকেরা বলেছেন, সীমান্তে ও সীমান্ত এলাকায় মাঝেমধ্যে কিছু অস্ত্রের চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশ আগ্নেয়াস্ত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে ঢোকে। এসব অস্ত্র নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, খুনোখুনি থেকে শুরু করে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজিতে ব্যবহার করা হয়।
বিজিবি বলেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কমিশনের বিনিময়ে সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র এনে এপারের অস্ত্র কারবারিদের হাতে তুলে দেন। অস্ত্র কারবারিদের হাত ঘুরে সেসব অস্ত্র পৌঁছে যায় অসাধু রাজনৈতিক নেতা, সন্ত্রাসী, উগ্রপন্থী, ডাকাত, ভূমিদস্যুসহ অপরাধীদের হাতে।
সীমান্তের যেসব পয়েন্ট দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে
বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ৩০ পয়েন্ট দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে। সেগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের রহনপুর রাঘব বাটি, গোপালপুর, মনাকষা, একই এলাকার সোনা মসজিদ, আজমতপুর, বিলভাতিয়া; ঝিনাইদহের মহেশপুরের জুলুলী; সাতক্ষীরার কলারোয়ার তলুইগাছা; যশোরের বেনাপোল ও চৌগাছা; রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট সীমান্ত; চুয়াডাঙ্গার দর্শনা; সাতক্ষীরার শাঁকারা; মেহেরপুর; কুমিল্লার সরাইল; বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি; কক্সবাজারের টেকনাফের খড়ের দ্বীপ ও উখিয়া; কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চরচিলামারী; সিলেটের কানাইহাট, জৈন্তাপুরের মিনাটিলা, জাফলংয়ের কাটরি; সুনামগঞ্জের ছনবাড়ি বাজার ও চারাগাঁও; দিনাজপুরের গিলবাড়ি ও মৌলভীবাজারের বড় লেখার তারাদরম সীমান্ত।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সীমান্তে দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে বলেই দেশের ভেতরে প্রতিদিন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অভিযানে কিছু উদ্ধার হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে দেশের ভেতরে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের টহল ও তল্লাশিচৌকি সক্রিয় আছে। আর পুলিশের ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন তিনি।
বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ৩০ পয়েন্ট দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে।
নজরদারি বাড়ানো হয়েছে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে ভারতের সঙ্গে থাকা অরক্ষিত বিভিন্ন সীমান্তের জেলাগুলো দিয়ে। এ ছাড়া মাছ ধরার ট্রলার, নৌকার মাধ্যমেও দেশে অস্ত্র আনা হচ্ছে। এসব অস্ত্র চোরাকারবারিদের ডেরায় প্রথমে মজুত করা হয়। এরপর বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, অবৈধ অস্ত্রের কারবারিরা এসব অস্ত্র ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা কৌশলে পৌঁছে।
কর্মকর্তারা বলেন, সীমান্তে যাঁরা অবৈধভাবে লোকজন পারাপারে জড়িত, তাঁদের বড় অংশ অস্ত্র চোরাকারবারির সহযোগী। চোরা কারবারিরা বড় অস্ত্রের চালান পার করতে ছোট চালানগুলো নিজেরাই পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেন। কারণ, একটি অভিযানে পুলিশকে ব্যস্ত রেখে চোরা কারবারিরা অন্য চালানগুলো নিরাপদে গন্তব্যে পাঠিয়ে দেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা ও কারাগার থেকে ৫ হাজার ৮১৭টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩৬২ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় অস্ত্র আইনে ২ হাজার ৩৯৩টি মামলা করা হয়েছে।
মাছ ধরার ট্রলার, নৌকার মাধ্যমেও দেশে অস্ত্র আনা হচ্ছে। এসব অস্ত্র চোরাকারবারিদের ডেরায় প্রথমে মজুত করা হয়। এরপর বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, অবৈধ অস্ত্রের কারবারিরা এসব অস্ত্র ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা কৌশলে পৌঁছে।
৩০ ডিসেম্বর ঢাকার পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরে বিজিবি দিবসে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র না ঢোকে, সে জন্য নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বিজিবি সূত্র জানায়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের অংশে তিন হাজার কিলোমিটারের মতো কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হলেও বাকি অংশে তা নেই।
বিজিবি মূলত সীমান্ত থেকে দেশের ভেতরের আট কিলোমিটার এলাকার ভেতরে অভিযান চালায়। বিজিবি তৎপর থাকায় সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকার সময় অস্ত্রের চালান ধরা পড়ছে।বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজশাহী সীমান্তে বিজিবির অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তল, আটটি গুলি ও চারটি ম্যাগাজিনসহ মাদক দব্য ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী উদ্ধার করে বিজিবি।
বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিজিবি মূলত সীমান্ত থেকে দেশের ভেতরের আট কিলোমিটার এলাকার ভেতরে অভিযান চালায়। বিজিবি তৎপর থাকায় সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকার সময় অস্ত্রের চালান ধরা পড়ছে।
‘সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে হবে’
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর রাজধানীতে পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান বিন হাদিকে গুলি করা হয়। পরে ১৮ ডিসেম্বরে সিঙ্গাপুরে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে পুঁজি করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাশাপাশি ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা করা হয়।
জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সংঘটিত হত্যাগুলোতে ব্যবহৃত অস্ত্র বিদেশে তৈরি বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।
শরিফ ওসমান বিন হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু হয়। ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এ অভিযানে ১৫ হাজার ৯৩৬ জন গ্রেপ্তার হন। তবে এ অভিযানেও চিহ্নিত, পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই কম। এ সময়ে ২৩৬টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।
গত শুক্রবার রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকার পোস্ট অফিস গলির একটি বাড়ি থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেহেদী হাসান ওরফে দিপুকে ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র, পিস্তল, রিভলভারসহ গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ দল।
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকার পোস্ট অফিস গলির একটি বাড়ি থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেহেদী হাসান ওরফে দিপুকে ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র, পিস্তল, রিভলভারসহ গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ দল।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আ ন ম মুনীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো উদ্ধার করতে পারেনি। সেটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বা হুমকি। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত দিয়ে যদি অবৈধ অস্ত্র ঢোকে, এই হুমকি আরও বেড়ে যায়। মুনীরুজ্জামান বলেন, এখন দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বেশ কিছুটা নাজুক অবস্থায় আছে। নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও বেশি তৎপর হতে হবে এবং গোয়েন্দা নজরদারির বৃদ্ধি করতে হবে। সীমান্ত যেকোনোভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে। এটা করতে পারলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, যেটা শান্তপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা খুবই প্রয়োজন।