সিলেটের নতুন পর্যটনকেন্দ্র কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর এলাকা
সিলেটের নতুন পর্যটনকেন্দ্র কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর এলাকাফাইল ছবি

পাহাড়-পাথর-জলের পর্যটনকেন্দ্র সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সীমান্তবর্তী সাদা পাথর এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াতে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি ও শীতকালে করোনা সংক্রমণ এড়াতে প্রতিদিন বিকেল চারটার পর আর কোনো নৌকা সাদা পাথর এলাকায় যাতায়াত করবে না।

আজ শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে এই নির্দেশনা কার্যকর করতে সাদা পাথর নৌপথ অভিমুখে কাঁটাতারের একটি ফটক স্থাপন করা হয়েছে এবং নির্দেশসংবলিত ব্যানার সাঁটানো হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন আচার্য আজ বিকেল চারটায় এ নির্দেশনা জারি করেন। এর আগে সাদা পাথর এলাকায় পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী ও পর্যটন সেবাসংশ্লিষ্ট সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে তিনি এক সভা করেন।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ এলাকায় সীমান্তের ধলাই নদের উৎসমুখে সাদা পাথর এলাকার অবস্থান। ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল লুংলংপুঞ্জি ও শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি, এপারে ধলাই নদের উৎসমুখের বিস্তৃত এলাকায় সারা বছর নদের পানি প্রবহমান থাকে। বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জির পাদদেশ থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে পাহাড়ের পাথরখণ্ড এপারে নেমে আসে। ২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলে পাথর জমা হওয়ায় কোম্পানীগঞ্জের তৎকালীন ইউএনও আবুল লাইছ পাথর সংরক্ষণ করেন। এ নিয়ে ২০১৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোয় ‘ধলাইমুখে আবার জমল ধলাসোনা’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। সেই থেকে এলাকাটি ‘সাদা পাথর’ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।

বিজ্ঞাপন
default-image

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত ২৬ মে থেকে টানা তিন দিন ভারী বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড়ি ঢল নেমেছিল। বৃষ্টি থামার এক দিন পর সাদা পাথর এলাকায় নতুন করে পাথর জমা হওয়ার খবর আসে। ওই দিনই একদল পরিদর্শক পাঠিয়ে নতুন পাথরের স্তূপ চিহ্নিত করা হয়। সাদা পাথর এলাকার এক পাশে রেলওয়ের রজ্জুপথের (রোপওয়ে) সংরক্ষিত এলাকা। উত্তরজুড়ে সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল লুংলংপুঞ্জি ও শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি। বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জির পাদদেশ থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে পাহাড় থেকে পাথরখণ্ড এপারে নেমে আসে। প্রথম দফায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে এই পাথর জমা হয়েছিল। স্থানটির অধিকাংশ পড়েছে পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের ভূমি শাখার হিসাবমতে, সাদা পাথর এলাকায় পাঁচ একর ভূমি প্রথম দফার পাহাড়ি ঢলে অন্তত ১৩টি আস্তরণে প্রায় ২০ ফুট পুরু হয়েছিল জায়গাটি। তিন বছরের মাথায় এবার সেই স্থানটির উত্তর দিকে বাংলাদেশ সীমানা অংশে জমা হয়েছে নতুন পাথর। মোট জায়গার পরিমাণ এখন প্রায় ১০ একর। সাদা, খয়েরি ও কালচে রঙের বোল্ডার পাথরের সঙ্গে সিঙ্গেল পাথরও রয়েছে। এই পাথরের বাজারমূল্য শতকোটি টাকার বেশি হবে। করোনাকালে আরও পাথর জমা হওয়ায় গত ১৮ জুলাই প্রথম আলোয় ‘সাদা পাথরে’ নতুন আশা শিরোনামে আরেকটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল।

সীমান্তের ওপারে পাহাড়, পাথর আর স্বচ্ছ জলের অবগাহনে বছরজুড়ে সাদা পাথর এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াত থাকে। সড়কপথে ‘সাদা পাথর পরিবহন’ নামের একটি বাস সার্ভিস চালুর পর প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে। এর মধ্যে শুক্র, শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকসংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এ বছর শীতকালে বিকেল চারটা থেকে সাদা পাথর অভিমুখে নৌকাসহ যেকোনো প্রকার নৌযান চলাচল বন্ধ করার নির্দেশনা কার্যকর করা হয়। এ-সংক্রান্ত উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনা আজ বিকেলে সাঁটানোর সময় কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও সুমন আচার্যের সঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. এরশাদ মিয়া, স্থানীয় পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, ট্যুরিস্ট ক্লাবের সদস্য এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোম্পানীগঞ্জ থানা-পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

default-image

ইউএনও প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাদা পাথর গন্তব্যে প্রতিদিন শতাধিক নৌকা চলাচল করে। এখানে ২ থেকে ৩ হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে। ছুটির দিন এই সংখ্যা হয় দ্বিগুণ। এর ফলে পর্যটকদের পদচারণের সঙ্গে নিরাপত্তা ও শীতকালে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিকেল চারটার পর যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সময়সূচি অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি নোটিশ আকারে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ এলাকায় বাংলাদেশের অন্যতম বড় পাথরকোয়ারি এই সাদা পাথর। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে সাদা পাথরের স্তূপ ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, সাদা পাথর হিসেবে পর্যটক আকর্ষণের স্থানটিতে ১৯৯০ সালে পাহাড়ি ঢলে প্রথম পাথর জমা হয়। কিন্তু সেগুলো সংরক্ষণ না করায় তখন ব্যাপক লুটপাট হয়েছিল। দুই যুগের বেশি সময়ের পর ২০১৭ সালের বর্ষাকালে আবার পাথর জমা হলে এবার স্থানীয় মানুষজন পাথর লুটপাটের বিরুদ্ধে নামেন। জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করায় গোটা এলাকা পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। গত বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে জমা হওয়া পাথরের স্তূপ আরও বিস্তৃত হয়েছে। সেখানে যাতায়াতে সময়সূচি নির্ধারণ করায় নিরাপত্তাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ অনেকটা দূর হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0