চুরি হওয়া চারটি গরুর তিনটি উদ্ধার, কান্না থেমে স্বস্তি রুমানাদের
পঞ্চগড়ে দুই বোনের বৃত্তি ও টিউশনির টাকায় কেনা চারটি গরু চুরি হওয়ার সাত দিন পর তিনটি গরু উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার বিকেলে পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের বিরাজোত এলাকা থেকে ওই তিনটি গরু উদ্ধার করে পঞ্চগড় সদর থানা-পুলিশ। এতে কান্না থেমে স্বস্তি ফিরেছে পরিবারটিতে।
রংপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী রুমানা আক্তার ও তাঁর বড় বোন আফসানা খাতুনের জমানো বৃত্তি ও টিউশনির টাকা দিয়ে চারটি গুরু কিনে পালতে শুরু করে তাঁদের পরিবার। ১৮ আগস্ট দিবাগত রাতে পঞ্চগড় সদর উপজেলার কামাত কাজলদিঘী ইউনিয়নের ঘটবর এলাকায় রুমানাদের বাড়ির গোয়ালঘরের দরজার শিকল কেটে প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের গরু চারটি নিয়ে যায় চোরেরা। পর দিন পঞ্চগড় সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা করেন রুমানার দিনমজুর বাবা আনিসুর রহমান। এরপর থেকেই পুলিশ গরুগুলো উদ্ধারের জন্য অভিযানে নামে।
পুলিশ জানায়, বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোসহ লাগাতার অভিযানের কারণে চুরি করা গরুগুলো বিক্রি করতে বা জেলার বাইরে নিয়ে যেতে পারেনি চোরেরা। উপায় না পেয়ে বুধবার বিকেলে অমরখানা ইউনিয়নের বিরাজোত এলাকায় একটি ফাঁকা স্থানে গাছের সঙ্গে গরু তিনটি বেঁধে রেখে পালিয়ে যায় তারা। খবর পেয়ে পুলিশ সেখান থেকে গরু তিনটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রংপুর মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী রুমানা আক্তারেরা চার বোন। কোনো ভাই নেই তাঁদের। দিনমজুর বাবার ১০ শতক ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। প্রায় তিন বছর আগে রুমানা ও তাঁর বড় বোন আফসানা খাতুনের দুটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে পাওয়া শিক্ষাবৃত্তির জমানো টাকা ও টিউশনি করানোর কিছু টাকা দিয়ে চারটি ছোট ছোট গরু কিনে দিয়েছিলেন বাবাকে। গরুগুলো বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা পরিকল্পনা আর স্বপ্ন ঘুরছিল রুমানার মাথায়। টিউশনি করে পড়ালেখা করলেও নিজেদের ভবিষ্যৎ, বিয়ে আর বাবার সংসারের নানা সমস্যার কথা ভেবে গরুগুলোর যত্ন নিতে বলেছিলেন বাবাকে। রাতের আঁধারে রুমানাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল চোরেরা। তিনটি গরু উদ্ধার হওয়ায় কান্না থেমে স্বস্তি ফিরেছে রুমানাদের পরিবারে।
রুমানা আক্তার বলেন, ‘গরু চারটি হারিয়ে আমরা সত্যিই দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। সাত দিন ধরে মা–বাবাকে কোনো সান্ত্বনা দিয়ে বোঝাতে পারছিলাম না। তাঁরা দুজনেই প্রায় খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। মা তো অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তারপরও পুলিশের আন্তরিক চেষ্টায় চারটির মধ্যে তিনটি গরু উদ্ধার করা গেছে। এতে আমাদের পরিবারে স্বস্তি ফিরে এসেছে। আমরা অনেক খুশি। আমরা চাই না আর কারও একমাত্র সম্বল বা স্বপ্ন এভাবে চুরি হোক।’
পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতের মাধ্যমে গরু তিনটি আজ বৃহস্পতিবার রুমানাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
দিনমজুর আনিসুর রহমানের চার মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে আফসানা খাতুন। তিনি ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক শেষ করেছেন। বর্তমানে তিনি স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। প্রায় দুই মাস আগে হালের গরু দুটি বিক্রি করে তাঁর বিয়ে দিয়েছেন বাবা। মেজ মেয়ে রুমানা আক্তার রংপুর মেডিকেল কলেজে ডেন্টাল বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। সেজ মেয়ে লাবনী আক্তার রংপুর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে (আইএইচটি) রেডিওলোজি বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। সবার ছোট রিপা আক্তার পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী।