তবুও অভিভাবকহীন রোগীদের কথা ভেবে কেঁদে আকুল আলিয়া
স্বাস্থ্য ক্যাটাগরিতে আলিয়া বেগম পেয়েছিলেন ‘ভিএসও-প্রথম আলো স্বেচ্ছাসেবা সম্মাননা ২০২০ ’। এবার তিনি নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে সে নিয়ে চিন্তা নেই তাঁর। পরিচয়হীন রোগীদের ‘অভিভাবক’ এই স্বেচ্ছাসেবী সেসব রোগীর কথা চিন্তা করে বাসায় শুয়ে কাঁদছেন।
আলিয়া হাসপাতালের ট্রলি টানেন। চিকিৎসকদের ফুটফরমাশ খাটেন। হাসপাতালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চোখ রাখেন, কোথায় পড়ে আছে অভিভাবকহীন রোগী। তিনিই সেসব রোগীর অভিভাবক হয়ে যান। চিকিৎসা করান। শুশ্রূষা দেন। সুস্থ হলে, পরিচয় পেলে ফিরিয়ে দেন অভিভাবকের কাছে। না পেলে প্রয়োজনে নিজের বাসায় রাখেন। বিনিময়ে কারও কাছ থেকে টাকা নেন না। অসহায় মানুষের সেবা তাঁর নেশায় পরিণত হয়েছে। এ জন্য সারা দিন হাসপাতালে থাকেন। তাতে সংসার চলে না। জীবিকার জন্য মূলত রাতে বাসায় ফিরে বই বাঁধাইয়ের কাজ করেন। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ধানমন্ডি ক্যাম্পাসে আলিয়াকে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ভলান্টারি সার্ভিসেস ওভারসিজ (ভিএসও) ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে ‘ভিএসও-প্রথম আলো স্বেচ্ছাসেবা সম্মাননা ২০২০’ প্রদান করা হয়।
আলিয়ার বয়স এখন ৩৫। থাকেন রাজশাহী নগরের মুন্সীডাঙ্গা এলাকায় ভাড়া বাড়িতে। সঙ্গে থাকেন তাঁর মা রওশন আর মেয়ে টুম্পা। সঙ্গে আরও একজন থাকে। তার নাম কেউ জানে না। সে নিজেও বলতে পারে না। হাসপাতালে পাওয়া ট্রেনের চাকার নিচে পড়ে হাত-পা কাটা একটি ছেলে। আলিয়ার সেবায় ছেলেটি বেঁচে যায়। একসময় সুস্থ হয়। সুস্থ রোগী আর হাসপাতালে রাখা যায় না। তাই তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন আলিয়া। সেই থেকে তার ঠিকানা হয়েছে আলিয়ার বাড়ি। আলিয়া নিজে যা খান, ছেলেটিও তাই খায়। আলিয়া তার নাম দিয়েছেন বোল্টু। বোল্টু এখন তার পরিবারের সদস্য।
আলিয়ার পৈতৃক নিবাস ছিল সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খাগা গ্রামে। একসময় জীবিকার প্রয়োজনে আলিয়ার মা চলে এলেন রাজশাহী শহরে। ১৯৯৯ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মা তাঁকে বিয়ে দেন। কিন্তু যৌতুকের টাকা দিতে না পারার কারণে তিন বছরের মাথায় তাঁকে ফেলে চলে যান তাঁর স্বামী। তখন মেয়ে টুম্পার বয়স মাত্র দেড় বছর। মায়ের মতোই আলিয়ার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার।
দেড় বছরের মেয়েকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন আলিয়া। কাজ নিলেন বই বাঁধাইয়ের। তখন এক হাজার পৃষ্ঠা বাঁধাই করলে পান ২৫ টাকা। তাতেও সংসার চলে না। এ সময় পরিচয় হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স নূরজাহান বেগমের সঙ্গে। তিনি তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেই থেকে হাসপাতালে ট্রলি ঠেলতে শুরু করেন তিনি। এখন হাসপাতালে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকের (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) কাজ করেন। একদিন তাঁর চোখের সামনেই অভিভাবকহীন দুজন মানুষ মারা গেলেন। তাঁদের কোনো পরিচয় জানা গেল না। বিষয়টি চরমভাবে নাড়া দিল তাঁকে। মূলত তখন থেকেই অভিভাবকহীন রোগী হাসপাতালে এলেই ছুটে যান আলিয়া। মুখে একটু পানি দেন, বাঁচানোর চেষ্টা করেন। নিজের টাকা দিয়েই কিনে আনেন জরুরি ওষুধ। মানুষটাকে সুস্থ করে তুলতে পারলেই তাঁর মুখে হাসি ফোটে। এমন শতাধিক মানুষকে সুস্থ করে পরিবারের কাছে তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আলিয়া বলেন, কেউ এ কাজের বিনিময়ে জোর করে টাকা দিলে তিনি কষ্ট পান। মনে হয় তাঁর আনন্দটা ফুরিয়ে গেল। নিজেকে বিক্রি করে দিলেন।
গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর হাসপাতালে আলিয়ার কাছে সাতজন অভিভাবকহীন রোগী ছিলেন। তাঁরা কেউ কথা বলতে পারেন না। নিজের বাড়ির ঠিকানা বলতে পারেন না। সব রোগীকে সুস্থ করে নাম-পরিচয় উদ্ধার করে তিনি তাঁদের নিজ বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা কয়েক শ অভিভাবকহীন রোগীকে আলিয়া ঠিকানায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। এ ধরনের রোগীরা সাধারণত আহত হয়ে হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে আসে। সে জন্য ৮ নম্বর ওয়ার্ড আলিয়ার ঠিকানা হয়ে গেছে। এসব দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তাঁকে ওই ওয়ার্ডেই দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে একটা কাজ দিয়েছে। তবে আলিয়ার প্রধান কাজ অভিভাবকহীন রোগীদের সুস্থ করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। বাসায় শুয়ে এখন সেই রোগীদের জন্য তিনি কাঁদছেন। বলছেন, তাঁদের এখন কে দেখবে। ছেলেমেয়েরা দেখে না, এমন একজন অসুস্থ মানুষকে বাসায় গিয়ে সেবা করেন আলিয়া। সেই মানুষটির কী হবে, তার কথা ভেবেও কেঁদে আকুল হচ্ছেন আলিয়া।