ঢাকার তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী জি এম জিয়াদের জন্ম পটুয়াখালীতে। পুরোনো দুর্দশার স্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন, কুয়াটায় যেতে মন টানত। কিন্তু যাতায়াতে দুর্ভোগের কথা মনে উঠলে কলিজায় পানি থাকত না। ফেরি পার হতে কী যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ছিল! নির্ঘুম রাত কেটে যেত পদ্মা পাড়ি দিতে। আবার বরিশালের শিকারপুর, দোয়ারিকা, দপদপিয়া, লেবুখালী পার হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত। বাকেরগঞ্জের শ্রীমন্ত ও বোয়ালিয়া নদীর ওপর ছিল লোহার সেতু (বেইলি ব্রিজ)। প্রায়ই অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে সেতু দুটি ভেঙে ধসে পড়ত। এতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হতো। জিয়াদ বলেন, ‘ভাবতেই পারি না সেই যুগের অবসান হতে যাচ্ছে। এটা অভাবনীয় ও স্বপ্নের মতো মনে হয়।’

বরিশাল আঞ্চলিক সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১৯ বছরে এই পথে নয়টি (পদ্মাসহ) ফেরিঘাটে সেতু নির্মিত হয়েছে। লোহার নড়বড়ে সেতু দুটিও পাকা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ২০ আগস্ট কলাপাড়া উপজেলার শিববাড়িয়া নদীর ওপর ‘শেখ রাসেল সেতু’ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরের বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি একই উপজেলার সোনাতলা নদীর ওপর ‘শেখ জামাল সেতু’ ও আন্ধারমানিক নদীর ওপর ‘শেখ কামাল সেতু’ একসঙ্গে উদ্বোধন করেন তিনি। এ ছাড়া ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পটুয়াখালীর লাউকাঠি নদীর ওপর ‘পটুয়াখালী সেতু’, ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর পায়রা (লেবুখালী) নদীর ওপর ‘পায়রা সেতু’, ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বরিশালের কীর্তনখোলা ও খায়রাবাদ নদীতে ‘আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু’, ২০০৩ সালের ৮ এপ্রিল বরিশালের সুগন্ধা দোয়ারিকা নদীর ওপর ‘এম এ জলিল সেতু’, ২০০৩ সালের ৩ এপ্রিল শিকারপুরে সুগন্ধা নদীর ওপর ‘ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু’ চালু হয়।

এর আগে নব্বইর দশকে বুড়িগঙ্গা সেতু নির্মিত হয়। বাকি ছিল পদ্মা। সেই সেতুটির দ্বারও খুলে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এই দীর্ঘ পথে ফেরি যুগের অবসান হবে।

৩০ বছর ধরে কুয়াকাটা-ঢাকা-বরিশাল-বরগুনা পথে বিভিন্ন পরিবহনের বাস চালিয়েছেন আবদুস সালাম। তিনি বলেন, বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে খুব কম। অধিকাংশ সময় ফেরিঘাটেই রাত কেটেছে। এখন ফেরি নেই, সবখানে সেতু হয়ে গেছে। পদ্মা সেতু চালু হলে দীর্ঘ কষ্টের অবসান হবে।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বরিশালের সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা প্রথম আলোকে বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণাঞ্চল অর্থনৈতিক, সামাজিক সব দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। সেতুর কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুনভাবে বরিশাল অঞ্চলের আত্মপ্রকাশ ঘটবে।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মানুষ এখন ঢাকা থেকে সকালে রওনা হয়ে কাজ শেষে আবার সন্ধ্যায় ঢাকায় ফিরতে পারবে। সারা দেশের বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তা এ অঞ্চলে আসতে শুরু করেছেন। কৃষি, পর্যটন, তৈরি পোশাক, মৎস্য ও শিল্প খাতে দ্রুত উন্নতি করবে এ অঞ্চল।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন