default-image

বগুড়া ছাত্রলীগের একসময় সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিট ছিল সরকারি আজিজুল হক কলেজ শাখা। ২০১৫ সালের ১২ মে কেন্দ্র থেকে কলেজ শাখার আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেখানে বেনজীর আহমেদ সভাপতি ও আসলাম হোসেন সাধারণ সম্পাদক পদ পান। পরের বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর বেনজীর ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান যুবলীগের ২ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির নেতা নুরুল ইসলামের সমর্থকদের সঙ্গে। এ সময় কলেজ ছাত্রলীগের নেতা ইব্রাহীম হোসেন ওরফে সবুজ খুন হন। এর জেরে শহরে মিছিল করে ছাত্রলীগ। একপর্যায়ে পুলিশের মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। এর জেরে বেনজীরকে সংগঠন থেকে প্রথমে বহিষ্কার এবং পরে আংশিক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর কে এম মোজাম্মেল হোসেনকে সভাপতি ও রাকিব হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে আবার আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু রাকিব হাসানের বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে সাত দিনের মাথায় ৪ নভেম্বর রাকিবকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এতে ভাগ্য খুলে যায় আবদুর রউফের। রাতারাতি সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন।

গত সাড়ে চার বছরে আবদুর রউফের বিরুদ্ধে কলেজে ভর্তি–বাণিজ্য, পরীক্ষার হলে নকল সরবরাহ, কলেজের আশপাশের ছাত্রাবাস ও ক্লিনিকে চাঁদাবাজি, কলেজের গাছ কেটে নেওয়া, ছাত্রাবাসে মাদকের কারবার, নেতাদের হয়ে নানা দপ্তরে টেন্ডারবাজি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে রাখা, নিজ এলাকায় বালু–বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ রয়েছে রউফের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। জেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের দুই নেতার প্রশ্রয়ে দিনের পর দিন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। উল্টো নেতাদের প্রশ্রয়ে জেলা কমিটির সভাপতি পদ বাগানোর আয়োজন প্রায় শেষ করেছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সব ছাপিয়ে তাকবীর হত্যা

এখন সব অপকর্ম ছাপিয়ে আবদুর রউফ আলোচনায় জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক তাকবীর ইসলাম খান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। এই মামলার প্রধান আসামি হয়ে এখন তিনি ফেরার। ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি।

default-image

আবদুর রউফকে ধরতে না পারলেও গ্রেপ্তারের পর তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আল আমিন (২৪) তাকবীর হত্যায় আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে আল আমিন উল্লেখ করেছেন, ঘটনার দিন আবদুর রউফ নিজেই চাপাতি হাতে তাকবীর ইসলামকে কুপিয়েছেন। কোপানোর পর সেই চাপাতি তাঁকে (আল আমিনকে) দেন রউফ।

আল আমিন সরকারি আজিজুল হক কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সম্মান শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। আদালতে তাঁর স্বীকারোক্তি প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন বগুড়া সদর ওসি হ‌ুমায়ূন কবীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আল আমিন জানিয়েছেন, ১১ মার্চ ধুনটে ছাত্রলীগের সমাবেশে যোগদান করতে যাওয়ার পথে তাকবীর ইসলাম খানের মোটরসাইকেলের সঙ্গে আবদুর রউফের মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। জেলা ছাত্রলীগের নেতারা বিষয়টি তাৎক্ষণিক মীমাংসা করে দেন। এর জেরে তাকবীর সমাবেশ শেষ হওয়ার আগেই তাঁর সমর্থকদের নিয়ে বগুড়া শহরের সাতমাথায় ফেরেন। এ সময় তিনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আবদুর রউফ বগুড়ায় ফিরে সরকারি আজিজুল হক কলেজের নতুন ভবনের আশপাশের ছাত্রাবাস থেকে ৩০-৩৫ জন সমর্থককে ডেকে নিয়ে সাতমাথায় রওনা দেন। রউফসহ কয়েকজনের হাতে ছিল চাপাতি। অন্যদের হাতে ছিল স্টেইনলেস স্টিলের (এসএস) রড।

ওসির ভাষ্য, আল আমিন স্বীকারোক্তিতে আরও উল্লেখ করেন, সাতমাথায় তাকবীর ও তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা হওয়ামাত্র রউফ তাঁর (তাকবীর) উদ্দেশে বলেন, ‘তুই নাকি মারবি, দেখি মার।’ এ সময় রউফকে তাকবীর বলেন, ‘তুই মেসে থাকিস, মারলে কী হবে?’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাকবীরকে চাপাতি দিয়ে কোপানো শুরু করেন রউফ। অন্যরাও হামলায় অংশ নেন। এর পাঁচ দিন পর গত মঙ্গলবার বিকেলে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তাকবীর।

রউফের বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার জন্য ছিল চাপ

তাকবীরের সমর্থকেরা অভিযোগ করেছেন, তাকবীরের ওপর হামলার পর ১৩ মার্চ রউফ জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ এক নেতার সঙ্গে সোনাতলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে গিয়েছিলেন। ওই নেতা রউফের বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার জন্যও পুলিশকে চাপ দেন। ওই নেতা রউফের পক্ষ নিয়ে আপস করার চাপ দেন পরিবারকে। তাকবীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মা আফরোজা ইসলাম রউফকে প্রধান আসামি করে থানায় মামলা করেন। তবে আওয়ামী লীগের ওই নেতা রউফকে বাঁচানোর নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন।

সরকারি আজিজুল হক কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসলাম আলী বলেন, রউফ বগুড়ার ধুনট উপজেলার বিলচাপড়ি গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান। অথচ তাঁর চলাফেরা ছিল বিলাসী। দামি মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে ঘুরতেন। গড়ে তুলেছেন কলেজকেন্দ্রিক বাহিনী। পদপদবির সুবাদে হেন অপকর্ম নেই, তিনি তাতে জড়াননি। নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েই তিনি এত দিন ছিলেন বেপরোয়া।

ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জানান, রউফ প্রভাব খাটিয়ে তাঁর বাবাকে ধুনটের একটি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির পদে বসিয়েছেন। ওই বিদ্যালয়ে নিয়োগ–বাণিজ্য করেছেন। রউফের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে বগুড়া শহরের একটি ক্লিনিক থেকে ১৫ লাখ টাকা চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত থাকারও অভিযোগ রয়েছে। অপারেশন থিয়েটারে একটি শিশুর মৃত্যুকে পুঁজি করে চিকিৎসকের কাছ থেকে ওই টাকা হাতিয়ে নেন রউফ।

default-image

জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার হয়ে নিজের বাহিনী নিয়ে টেন্ডারবাজির অভিযোগ আছে রউফের বিরুদ্ধে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নেতার হয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের ঠেকানোর দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। পলাতক থাকায় এসব অভিযোগের বিষয়ে রউফের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তাকবীরের ওপর হামলার পর আবদুর রউফ প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘তাকবীরই আমাকে মারার জন্য ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। এতে আমার সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর মারামারি হয়।’

জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাইমুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘রউফ ও তাকবীর—দুজনই আমার ঘনিষ্ঠ ছিল। রউফ যেটা করেছে, এর মাশুল দিতে হবে। ইতিমধ্যেই সংগঠন থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ আগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, এ প্রশ্নে নাইমুর বলেন, ‘এত দিন তাঁর বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করেনি।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন