নড়াইলে সংঘর্ষে চারজনের নিহত হওয়ার পেছনে দুই সাবেক চেয়ারম্যানের দ্বন্দ্ব
নড়াইল সদর উপজেলায় পাল্টাপাল্টি হামলায় বাবা-ছেলেসহ চারজন নিহত হওয়ার পেছনে রয়েছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক দুই চেয়ারম্যানের দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব। এর আগেও দুই পক্ষ একাধিকবার সংঘর্ষে জড়ায়। তবে এবারই প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।
সোমবার ভোররাতে উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের বড়কুলা এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। ঘটনাস্থলে নিহত হন খলিল শেখ, তাঁর ছেলে তাহাজ্জুদ শেখ ও তাঁদের প্রতিবেশী ফেরদৌস শেখ। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে মারা যান ফকির নামের আরও একজন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে তাঁদের নাম–পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নে দুটি পক্ষ বিদ্যমান। একটি পক্ষের নেতৃত্ব দেন ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যা। আরেক পক্ষের নেতৃত্ব দেন সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল শেখ। তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি বর্তমানে জেলে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খায়রুজ্জামান ও উজ্জ্বল শেখদের দ্বন্দ্ব গোষ্ঠীগত, কয়েক দশকের পুরোনো। দুই পক্ষ বিভিন্ন সময়ে এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে একে-অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। দুই সাবেক চেয়ারম্যানের নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের সঙ্গেই ওঠবস রয়েছে। কয়েক দিন ধরে দুটি পক্ষের মধ্যে আধিপত্য ও পূর্ববিরোধের জের ধরে উত্তেজনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত সোমবার ভোরে খায়রুজ্জামান পক্ষের লোকজন বড়কুলা গ্রামে প্রতিপক্ষের লোকজনের ওপর হামলা চালায়।
এতে ঘটনাস্থলে নিহত হন উজ্জ্বল শেখ পক্ষের খলিল শেখ, তাঁর ছেলে তাহাজ্জুদ শেখ ও প্রতিবেশী ফেরদৌস শেখ। পরে হামলাকারীদের প্রতিরোধ এবং পাল্টা হামলা চালালে খায়রুজ্জামানের পক্ষের ওসিকুর ফকির নামের একজন আহত হন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে থাকা খলিল, তাহাজ্জুদ ও ফেরদৌসের মরদেহ উদ্ধারে গেলে পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজনের প্রতি চড়াও হন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। তাঁরা দীর্ঘ সময় লাশ আটকে রাখেন। পরে পুলিশ ও নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের প্রচেষ্টায় দুপুরের দিকে লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠাতে রাজি হয় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। অন্য লাশটি হাসপাতাল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যার বাড়ি সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের তারাপুরে। বড়কুলায় নিহত খলিল শেখ, তাঁর ছেলে তাহাজ্জুদ শেখ ও প্রতিবেশী ফেরদৌস শেখদের আগের বাড়িও তারাপুরে। সেখানে খায়রুজ্জামান মোল্যাদের সঙ্গে বিরোধের কারণেই বছর দশেক আগে তারাপুর থেকে এসে বড়কুলায় বসতি গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা। তবে বিরোধ এড়াতে পারেননি। গ্রাম বদলালেও ইউনিয়নের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে খায়রুজ্জামানের বিরোধী অবস্থান ছিল খলিলদের।
ওই এলাকার কয়েকজন বলেন, এ দুই পক্ষের মধ্যে বহু বছর ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলছে। বিরোধের জেরে খলিলরা এলাকা ছেড়ে আরেক এলাকায় চলে যান; কিন্তু ঝামেলা পিছু ছাড়ল না। মাসুম মুন্সী নামের একজন বলেন, ‘আজ যা হলো, তা কল্পনা করা যায় না। আমরা চাই, এমন দিন আর যেন না দেখতে হয়। আর কারও মধ্যে এমন দ্বন্দ্ব আমরা চাই না।’
নিহত খলিল শেখের পরিবারের সদস্যরা জানান, খায়রুজ্জামানের লোকজন এসে কোনো কথা না বলেই ঘরে ঢোকে। তারপর মহিলাদের সরিয়ে দেয়। আর পুরুষদের ধরে বাইরে এনে কুপিয়ে হত্যা করে। তাঁরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান।
এদিকে ঘটনার পর থেকে খায়রুজ্জামান ও তাঁর পক্ষের লোকজন এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। তাঁদের পক্ষের নিহত ওসিকুরের মরদেহ হাসপাতালে থাকলেও সেখানে স্বজনদের কেউ নেই।
তবে খায়রুজ্জামানের বাড়িতে গেলে বাড়িতে থাকা নারী সদস্যরা খায়রুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন খায়রুজ্জামান, তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে।
এ ঘটনার পর থেকে ওই এলাকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে। পরিবেশ শান্ত রাখতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী সেখানে উপস্থিত রয়েছে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল মামুন শিকদার বলেন, ইতিমধ্যে এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত সবাইকে ধরতে অভিযান চলছে। এ ছাড়া মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।