ভৈরবে বাজারের নাম নিয়ে সংঘর্ষে দুজন নিহত: ৪ দিন পর মামলা, পুরুষশূন্য এলাকা

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় বাজারের নামকরণ নিয়ে সংঘর্ষে কয়েকটি বাড়িঘরও ভাঙচুর করা হয়। গত সোমবার বিকেলে আকবরনগর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আকবরনগর না মিরারচর—বাজারের নাম নিয়ে সংঘর্ষে দুজন নিহত হওয়ার চার দিন পর দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। দুই মামলায় ৮৯ জনকে এজাহারভুক্ত এবং আরও ১৩০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে।

তবে আজ শনিবার দুপুর পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত আকবরনগর গ্রামে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গতকাল শুক্রবার রাতে ভৈরব থানায় মামলা দুটি করা হয়। ভৈরব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল কবির আজ শনিবার সকালে প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আরও পড়ুন

পুলিশ জানায়, গত সোমবারের সংঘর্ষে আহত হয়ে মিরারচর গ্রামের মাসুদ মিয়া ও হিরণ মিয়া মারা যান। মাসুদ হত্যা মামলার বাদী হয়েছেন তাঁর স্ত্রী তাসলিমা বেগম। ওই মামলায় ৪৯ জনকে এজাহারভুক্ত এবং ৭০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। প্রধান আসামি আকবরনগর গ্রামের জিল্লু মিয়া।

হিরণ মিয়া হত্যা মামলায় বাদী হয়েছেন মিরারচরের রতন মিয়া। এ মামলায় ৪০ জনকে এজাহারভুক্ত এবং ৬০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। প্রধান আসামি করা হয়েছে আকবরনগর গ্রামের লাল মিয়াকে।

মুঠোফোন নম্বর বন্ধ থাকায় দুই মামলার প্রধান আসামি জিল্লু মিয়া ও লাল মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হামলা–আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ি। আজ শনিবার দুপুরে আকবরনগর গ্রামের নয়াহাটি এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

ওই ঘটনায় এ পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় আক্ষেপ করেন রতন মিয়া। তিনি বলেন, ‘দুজনকে হত্যা করা হলো, অসংখ্য মানুষ আহত হলো। অথচ এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা গেল না।’ মামলা করতে চার দিন সময় লাগার কারণ জানতে চাইলে রতন বলেন, প্রথমে দাফন সম্পন্ন করতে হয়েছে। পাশাপাশি প্রকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা করতেও সময় লেগেছে।

ভৈরব থানার পরিদর্শক (তদন্ত) লিমন বোস বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাই কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

আরও পড়ুন

গ্রামে আতঙ্ক, ফিরতে পারছেন না পুরুষেরা

সংঘর্ষের দিন বিকেল থেকেই আকবরনগর গ্রামের বাসিন্দারা গ্রাম ছাড়তে শুরু করেন। পরদিন গ্রামটি প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। পরে অনেক নারী, শিশু ও বৃদ্ধও নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।

আজ দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, বিরোধপূর্ণ বাজারটি প্রায় লোকশূন্য। এর অধিকাংশ দোকান বন্ধ ছিল। এ ছাড়া বাজারসংলগ্ন বাসস্ট্যান্ডেও হাতে গোনা কয়েকজনকে দেখা গেছে।

আকবরনগরের একাধিক বাসিন্দার দাবি, প্রথম দুই দিন অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চলে। গত দুই দিনে আকবরনগর গ্রামে নতুন করে আগুন না লাগানো হলেও থেমে থেমে ভাঙচুর ও লুটপাট হচ্ছে। গতকাল মাইকিং করে মিরারচর গ্রামের মানুষকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। অল্পসংখ্যক নারী ছাড়া বিশেষ করে পুরুষেরা এখনো গ্রামে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না।

আকবরনগরে টহল দিচ্ছে পুলিশ সদস্যরা
ছবি: প্রথম আলো

ভৈরব ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. আল আমিন বলেন, সংঘর্ষের পর কয়েক দিন আকবরনগর গ্রামটি প্রায় জনশূন্য থাকায় অনেক ঘর রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে আকবরনগরে ২৫ জন পুলিশ সদস্য টহলে রয়েছেন। গ্রামের বাসিন্দা নন—এমন কাউকে প্রবেশ করলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরির কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন। দুই গ্রামে শান্তি ফেরাতে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল মিরারচর গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের বৈঠক হয়েছে। সেখানে নতুন করে হামলা না চালানোর আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো শেষ হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

আরও পড়ুন

বিরোধের সূত্র

আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের মধ্য দিয়ে ভৈরব–ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক গেছে। সড়ক নির্মাণের পর সেখানে একটি বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সাল থেকে দুই পাশে বাজার বসতে শুরু করে। দীর্ঘদিন বাজারটি ‘আকবরনগর–মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হলে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এরপর সাইনবোর্ড ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

সম্প্রতি দুই গ্রামের দুজনের কথা-কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আবার বাড়ে। গত রোববার স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমের উপস্থিতিতে বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে বাজারের নাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরদিন সোমবারই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত হন দুই ব্যক্তি।

আরও পড়ুন