আড়াই শ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক গম্বুজের খানবাড়ি মসজিদ
এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির ভেতর ও বাইরে কারুকার্যময়। দেয়ালের পুরুত্বও প্রায় ৪০ ইঞ্চি। মসজিদের দুপাশে কবরস্থান এবং সামনে–পেছনে রয়েছে পুকুর। মসজিদের ছায়া পুকুরের পানিতে জ্বলজ্বল করে। প্রত্যন্ত গ্রামে নান্দনিক এই মসজিদ টিকে আছে প্রায় আড়াই শ বছর ধরে। স্থানীয় বাসিন্দারাও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে মসজিদটিকে টিকিয়ে রাখতে চান।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের জোরবাড়িয়া গ্রামে দেখা মেলে এক গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন এই মসজিদের। জোরবাড়িয়া পূর্বভাটিপাড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ নাম হলেও স্থানীয়দের কাছে খানবাড়ি মসজিদ নামেই এটি পরিচিত। ঐতিহ্যের ধারক এ স্থাপনা ১২০০ হিজরিতে নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী ও দানশীল ব্যক্তি হায়াত খান। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ একনজর দেখতে ছুটে আসেন এই ঐতিহাসিক মসজিদটি। মসজিদের পাশেই রয়েছে ‘বিবিঘর’ নামে পরিচিত একটি মানতের ঘর। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় অসুস্থতার নিরাময়ের আশায় এখানে মানত করা হতো, যদিও বর্তমানে এ প্রথা প্রায় বিলুপ্ত।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে এক গম্বুজের প্রাচীন এই মসজিদে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদের পেছনে ৫২ শতাংশ জমির একটি পুকুর এবং সামনে শানবাঁধানো ঘাটসহ প্রায় এক একর আয়তনের আরেকটি পুকুর রয়েছে। মসজিদের দুই পাশে রয়েছে কবরস্থান; এলাকার কেউ মারা গেলে এখানেই দাফন করা হয়। মৃত্যুর আগে হায়াত খান মসজিদের নামে সাত একর জমি লিখে দিয়ে যান। ওই জমির আয় থেকেই বর্তমানে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। মসজিদটির চার কোণে চারটি পিলার রয়েছে, যার উপরিভাগ কলসি আকৃতির কারুকাজে অলংকৃত। চৌকো কাঠামোর ওপর ছাদজুড়ে রয়েছে একটি বড় গম্বুজ। কথিত রয়েছে ফ্রান্স থেকে কারিগর এনে করা হয় এই মসজিদ।
মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সাত্তার খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই মসজিদ যখন করা হয়, তখন তো সিমেন্ট ছিল না। চুন-সুরকি ও ইট দিয়ে এই মসজিদ করা হয়। মানুষের কাছে শুনেছি ফ্রান্স থেকে লোক এনে এই মসজিদটি করা হয়। যিনি এই মসজিদ করেছেন, তিনি অনেক সম্পদশালী ছিলেন। তিনি মসজিদের জন্য সাত একর জমি দান করে গেছেন। এই মসজিদে অনেক দূরদূরান্তের লোক আসে। এখন পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ হলেও আমাদের এই মসজিদে এমনিই লোক ভরপুর থাকে।’
আসরের নামাজ পড়ে বের হওয়া মো. মোনায়েম খান বলেন, এই মসজিদ অনেক পুরোনো। এই মসজিদের কারুকার্য ভেঙে গেলে সেগুলো মেরামত করা হয়েছে গেল বছর। এই মসজিদটি ঐতিহ্যের জন্য এখনো চালু রাখা হয়েছে। এই মসজিদে নামাজ পড়তে খুব ভালো লাগে। গরমের দিন ঠান্ডা ও শীতে গরম অনুভূত হয়। প্রকৌশলীরা বলে গেছেন, আরও এক থেকে দেড় শ গেলেও মসজিদের কিছু হবে না।
প্রাচীন মসজিদটির ইতিহাস বর্ণনা করেন জোরবাড়িয়া পূর্বভাটিপাড়া খানবাড়ি জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম খান। তিনি বলেন, এই মসজিদ ১২০০ হিজরিতে নির্মিত হয়। হায়াত নামের একজন এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁরা (হায়াত খান) তিন ভাই ছিলেন। এর মধ্যে হায়াত খানের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। একটিমাত্র কন্যাসন্তান ছিল। নিজে জমি দান করে তিনি এই মসজিদ করেছেন, মসজিদের দুপাশে গোরস্থান রয়েছে, মসজিদের সামনে পুকুর রয়েছে।
আবদুল করিম খান আরও বলেন, এই এলাকায় প্রথম এই মসজিদ হয়। তখন আশপাশে কোথাও মসজিদ ছিল না। এই মসজিদে এক কিলোমিটার দূর থেকে মানুষ এসে জুমার নামাজ আদায় করত। মসজিদের উত্তর পাশে একটি ঘর রয়েছে। এটিকে বিবির ঘর বলা হতো। মুরব্বিরা তাঁদের বলেছেন, এই ঘর নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল মানুষ আগে অসুখ-বিসুখ হইলে বিবির ঘরে শিরনি মানত। শিরনি এনে সেই ঘরে রাখতেন এবং মুসল্লিরা জুমার নামাজ পড়ে সেই শিরনি খেয়ে দোয়া করতেন।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মজিবুর রহমান খান বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মসজিদ করে গেছেন। এই মসজিদ পরিচালনায় কোনো দান গ্রহণ করা হয় না। নিজেরাই অর্থের জোগান দিয়ে এটি পরিচালনা করা হয়।’