‘স্বাধীনভাবে বাঁচতে’ ঘর ছাড়ে প্রাথমিকের চার ছাত্রী, ঢাকায় বাসা না পেয়ে যায় হবিগঞ্জে

কুমিল্লা থেকে ঢাকায় যাওয়ার পর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থেকে চার ছাত্রীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরেছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে বিভিন্ন তরুণদের সঙ্গে পরিচয়। এরপর তাঁদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে এবং স্বাধীনভাবে বাঁচতে ঘর ছাড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া কুমিল্লার তিন ছাত্রী। তাদের মধ্যে একজন আবার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোনকেও সঙ্গে নেয়। গত সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে তারা বাসা থেকে বের হয়ে যায়।

পুলিশের তথ্যমতে, চার শিশু কুমিল্লা থেকে প্রথমে ঢাকায় যায়। সেখানে বাসা ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে তারা চলে যায় হবিগঞ্জে। কিন্তু সিএনজিচালিত এক অটোরিকশাচালকের সন্দেহ হওয়ায় তিনি বিষয়টি পুলিশকে জানান। পরে সোমবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকা থেকে তাদের উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নতুন করে কুমিল্লায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাড়ি ছাড়ার সময় পরিবারের মূল্যবান জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল তারা। দুই বোনের একজন তাদের পরিবারের একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন কুমিল্লার টাউন হল মার্কেটের একটি দোকানে চার হাজার টাকায় বিক্রি করে। সেই টাকা নিয়ে তারা ঢাকায় রওনা হয়।

আজ বুধবার বেলা দুইটার দিকে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান চার শিক্ষার্থীকে উদ্ধারের বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তারা সবাই কুমিল্লা নগরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া তিনজনের মধ্যে দুজনের বয়স ১২, অন্যজনের ১৩ বছর। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া মেয়েটির বয়স ৮ বছর।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, গত সোমবার বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে তারা বাড়ি থেকে বের হলেও কেউ শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়নি। বিকেলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে এলে বিষয়টি তাঁকে (পুলিশ সুপার) জানানো হয়। এরপর গোয়েন্দা পুলিশ ও কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ অনুসন্ধানে নামে। পরে স্বজনেরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পুলিশ সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং দেশের বিভিন্ন থানায় শিক্ষার্থীদের ছবি-পরিচয়সহ বেতারবার্তা পাঠায়। পরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার পুলিশের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়।

সন্তান কখন, কোথায় যাচ্ছে, বাসায় কীভাবে সময় কাটাচ্ছে, কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
মো. আনিসুজ্জামান, পুলিশ সুপার, কুমিল্লা

চার ছাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তারা নিয়মিত মুঠোফোন ব্যবহার করত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। টিকটকে ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে তাদের পরিচিতি ও যোগাযোগ তৈরি হয়। একই পরিবারের দুই বোনের মধ্যে বড় মেয়েটির সঙ্গে চার তরুণের; ১২ বছর বয়সী মেয়েটির সঙ্গে দুই তরুণের এবং ১৩ বছরের মেয়েটির সঙ্গে আরও দুই তরুণের পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। তবে ওই ছেলেদের প্রকৃত ঠিকানা তারা জানত না।

কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ চার ছাত্রীকে উদ্ধারের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। বুধবার দুপুরে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় থেকে তৈরি হওয়া ধারণা ও কল্পনায় বিভ্রান্ত হয়ে তারা বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল ঢাকায় গিয়ে নিজেরা উপার্জন করবে, স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করবে এবং পরিচিত ছেলেদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করবে। এ জন্য তারা বাসা থেকে স্বর্ণালংকার ও মুঠোফোন নিয়ে বের হয়। একই পরিবারের দুজনের ক্ষেত্রে বড় বোন বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে ছোট বোন বিষয়টি বুঝতে পারে। তাকে সঙ্গে না নিলে বাবা-মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল সে। পরে তাকেও সঙ্গে নেওয়া হয়।

কুমিল্লা থেকে ঢাকা, তারপর হবিগঞ্জ

পুলিশের তথ্যমতে, সোমবার সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে চার শিক্ষার্থী সরাসরি ঢাকায় চলে যায়। বেলা ১১টার মধ্যে তারা সেখানে পৌঁছায়। ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও বয়স কম হওয়ায় পায়নি। পরে তারা হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ, চারজনের মধ্যে একটি মেয়ের দাদাবাড়ি চুনারুঘাটে। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় অন্ধকারে ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিল না।

একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকে তারা। তাদের আচরণ ও পরিস্থিতি দেখে অটোরিকশাচালকের সন্দেহ হয়। তিনি বিষয়টি স্থানীয় পুলিশকে জানান। পরে পুলিশ গিয়ে চারজনকে উদ্ধার করে। পুলিশ সুপার বলেন, ওই চালকের দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণেই দ্রুত শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

আরও পড়ুন

বাড়ি ছাড়ার সময় পরিবারের মূল্যবান জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল তারা। দুই বোনের একজন তাদের পরিবারের একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন কুমিল্লার টাউন হল মার্কেটের একটি দোকানে চার হাজার টাকায় বিক্রি করে। সেই টাকা নিয়ে তারা ঢাকায় রওনা হয়। পরে গোয়েন্দা পুলিশ মুঠোফোনটি উদ্ধার করে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, সন্তান কখন, কোথায় যাচ্ছে, বাসায় কীভাবে সময় কাটাচ্ছে, কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হলে এবং সন্তানদের প্রতি যথাযথ নজরদারি থাকলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এ ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানায় করা সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে তিনি জানান।