কুমিল্লায় মেডিকেল শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার, পাঁচবার অকৃতকার্য হয়েছিলেন ‘মানসিক চাপে’

কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিনছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লায় একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে হোস্টেলের কক্ষ থেকে ওই শিক্ষার্থীকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে সহপাঠীরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

নওশিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজারসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি খুলনা সদরে। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছোট।

সহপাঠীদের অভিযোগ, নওশিন মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষকের রোষানলে ছিলেন। তাঁকে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপে রাখা হতো। একটি বিষয়ে পাঁচবার পরীক্ষা দিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি। এতে মানসিক চাপে ১০৯টি ট্যাবলেট সেবন করে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

আজ শনিবার সকালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই শিক্ষার্থীর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। নওশিনের সহপাঠীদের অভিযোগ, কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের একজন শিক্ষকের রোষানলে বারবার ফেল করতে হয়েছে নওশিনকে। এটি তাঁর ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে। ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

তবে ঘটনার পর বিষয়টি আলোচনায় আসার পর অ্যানাটমি বিভাগের ওই শিক্ষক গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। তিনি কারও কল ধরছেন না। এ জন্য তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

খুলনার সরকারি করনেশন গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কেসিসি উইমেন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে কুমিল্লার বেসরকারি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন অর্পিতা নওশিন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নওশিনের সহপাঠীরা বলেন, প্রথম বর্ষ থেকেই কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের ওই শিক্ষকের রোষানলে পড়েন নওশিন। প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় অন্যান্য সব বিষয়ে পাস করলেও অ্যানাটমিতে ফেল করেন তিনি। এরপর গত তিন বছরে আরও চারবার একই বিষয়ে পরীক্ষা দিলেও প্রতিবারই অকৃতকার্য হন। প্রথম বর্ষে থাকতেই প্রকাশ্যে তাঁকে ফেল করানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে ঠিক কী কারণে ওই শিক্ষক এমন আচরণ করেছিলেন, তা স্পষ্ট নয়।

২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, গত ৮ মার্চ চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তাঁদের ব্যাচের তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। একই সেশনের অন্য শিক্ষার্থীরা এখন পঞ্চম বর্ষে পড়লেও নওশিন প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষাতেই আটকে ছিলেন।

নওশিনের ভাই শাহরিয়ার আরমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার বোনের আত্মহত্যা করার মতো মানসিকতা ছিল না। কলেজের মানসিক চাপই তাকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে। প্রথম বর্ষ থেকেই তাকে মানসিকভাবে নিপীড়ন করা হয়েছে। সবাই পাস করলেও আমার বোনকে একটি বিষয়ে আটকে রাখা হয়েছে। তার সমস্যা কী, সেটাও কেউ বলেনি।’ তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবারও তার সঙ্গে কথা হয়েছে। ফরম পূরণের জন্য টাকা চেয়েছিল। আমি আশ্বস্ত করেছিলাম টাকা পাঠাব। এমন খবর পাব, কখনো ভাবিনি।’

আজ বিকেলে কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৭ মিনিটে ওই শিক্ষার্থীর অসুস্থতার খবর পাই। খবর পাওয়ার পরপর জরুরি বিভাগে থাকা সব চিকিৎসককে প্রপার ট্রিটমেন্টের অনুরোধ জানাই। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানায় ওই ছাত্রী মারা গেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি ও পরিচালক হাসপাতালে ছুটে যাই। কিন্তু আমাদের ছাত্রীকে আর বাঁচাতে পারিনি।’ তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছি। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানা থেকেও বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে শিক্ষার্থীর ভাই বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মরদেহ নিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় আমরাও চরমভাবে শোকাহত।’

অ্যানাটমি বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে। এ জন্যই আমরা তদন্ত কমিটি করেছি। যদি এ ঘটনায় কেউ যুক্ত থাকে, তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিক্ষার্থীর পরিবার বিষয়টি নিয়ে কোনো অভিযোগ করেনি। এরপরও পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।