কুমিরের আক্রমণে শিশুর মৃত্যুর পর মানসিক ভারসাম্যহীন মাকে খুঁজে পেল পরিবার
প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে ছোট্ট ফাতেমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান মা ফজিলা খাতুন। ময়মনসিংহ থেকে ঘুরতে ঘুরতে একপর্যায়ে চলে আসেন বাগেরহাটে। ওদিকে পরিবারের লোকজন সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও তাঁদের আর পাননি। একপর্যায়ে তাঁদের খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেয় পরিবারটি। অবশেষে ফজিলাকে পেয়ে ভাই হারেজ আলী (৩৮) বলেন, ‘হে আমার বড় বইন। ছোডোকাল দেই হে (ফজিলা) এট্টু হওজ (বোকাসোকা) আছিল। তয় বাড়ি থেইক্কা আসার প্রায় পাঁচ বছর আগ দে একদম পাগল অবস্থা (মানসিক ভারসাম্যহীন)।’
এক বছরের বেশি সময় ধরে ফজিলা খাতুন তাঁর মেয়ে ফাতেমা খাতুনকে নিয়ে থাকতেন বাগেরহাটের হজরত খান জাহান (রহ.)–এর মাজার এলাকায়। তবে কেউ জানতেন না ফজিলার নাম। সবার কাছে তাঁর পরিচয় ছিল, ফাতেমার মা ও মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে। গত সোমবার রাতে মাজারসংলগ্ন দিঘির কুমির টেনে নিয়ে যায় শিশু ফাতেমাকে। এক দিন পর মঙ্গলবার ভোরে দিঘিতে লাশ মেলে শিশুটির। এদিন দুপুরে মাজার প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে দিঘির পাড়ে দাফন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বুধবার দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ওই কুমিরটিকেও।
দিঘিতে শিশুর মৃত্যুর খবর প্রকাশ পায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এসব খবর ও ভিডিও নজরে পড়ে ময়মনসিংহে থাকা ফজিলার পরিবারের চোখে। তাঁরা ছবি দেখে নিশ্চিত হন নিহত ছোট্ট ফাতেমা ও তাঁর মা তাঁদের পরিবারেরই সদস্য। খোঁজ পাওয়া যায় ফজিলা খাতুনের। এরপর ওই দিনই ময়মনসিংহ থেকে পরিবারের সদস্যরা ফাতেমাকে নিতে রওনা হন বাগেরহাটের উদ্দেশে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে খানজাহান (রহ.)-এর মাজারে পৌঁছে তাঁরা খুঁজে পান ফজিলাকে। সন্তান মৃত্যুর তিন দিন পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাবার খান ফজিলা। পরে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে দুপুরে ফজিলাকে গ্রহণ করেন তাঁর ভাই হারেজ আলী (৩০)।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর হরিচাঁদ গ্রামে ফজিলা খাতুনের বাড়ি। প্রায় ২৮ বছর আগে পার্শ্ববর্তী চর খরিচা গ্রামের মমরুজ আলীর সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। পাঁচ সন্তানের মধ্যে কুমিরের আক্রমণে নিহত ফাতেমা খাতুন ছিল সবার ছোট।
মাকে নিতে বৃহস্পতিবার নানি, মামা, খালুদের সঙ্গে বাগেরহাটে এসেছিল ফজিলার তৃতীয় সন্তান বজলুর রহমান (১৪)। তিন বছরের বেশি সময় পর মায়ের দেখা পাওয়া বজলুর বলে, ‘ফাতেমা আমার বোন। মোবাইলে খবর দেইখ্যা আমরা এই হানে আসছি।’
ফজিলার ভাই পেশায় কাঁচামাল ব্যবসায়ী হারেজ আলী জানান, ফাতেমার জন্মের আগে থেকে তাঁর বোন বেশি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। তখন থেকেই ফজিলা বাবার বাড়িতে থাকতেন। ফাতেমার জন্ম ও নিখোঁজের আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। হারেজ আলী বলেন, ‘একদিন ঝড়তুফান ও বৃষ্টির মাঝে আমার বোন মাইয়াডারে নিয়া বাড়ি তে বের হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম, কোনো হানে পাই নাই। নিউজটা মোবাইলে দেইখা আমরা আইছি।’
ফজিলাকে নিতে তাঁর এক ছেলে, মা, দুই ভাই, চাচা ও চাচাতো বোনের স্বামী—মোট ছয়জন এসেছিলেন বাগেরহাটে। তাঁদের ভাষ্য, ফজিলা তাঁদের চিনেছেন। ফাতেমাকে কুমিরে টেনে নেওয়ার কথাও বলেছেন।
হারেজ আলী বলেন, ‘সকালে এসে দেখি মাজারের পূর্ব পাশে একটা ঘরের সঙ্গে ঠ্যাস দিয়ে শুয়ে আছে আমার বোন। আমারে দেখে হাট করে উঠে বসে। পরে তাঁকে (বোন) নিয়ে ফাতেমার কবরের কাছে গেছি। দিঘির চারপাশ থেকে ঘুরছি। আমারে বলে, “আমার ফাতেমা আমার কাছে নাই। আমার বাচ্চারে কুমিরে খাই হ্যালছে, কুমিরে আমারে খাইয়া হ্যালাক। আমি যাইতাম না।”’
ফজিলার মা হাজেরা খাতুন বলেন, ‘সারা রাইত বাসে, ভোরে মাজারে আইছি। আমার ছয়জনের (সন্তান) মাঝে ফজিলা বড়। আমারে দেইখা কয়, “আমার মেয়ে না দিলে আমি যাইতাম না। আমার মেয়ে হাত উঠায় ডাকছে আম্মা আম্মা করছে।” ফজিলা কান্তে পারে না, হেই শক্তি নাই। আমরা ওরে বাড়ি নিয়া যাইতে আইছি।’
পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁদের সঙ্গে নিয়ে আসা ফজিলার জাতীয় পরিচয়পত্র, নিহত ফাতেমার টিকা কার্ডসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সমাজসেবা, মহিলা অধিদপ্তর ও থানা–পুলিশের উপস্থিতিতে জিম্মানামায় সই করিয়ে ফাতেমাকে তাঁর ভাইয়ের জিম্মায় দেওয়া হয়।
বাগেরহাট সদরের ইউএনও মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, ‘মাজারে কুমিরের আক্রমণে মারা যাওয়া ফাতেমার মানসিক ভারসাম্যহীন মাকে নেওয়ার জন্য তাঁর মা-ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা আসেন। কাগজপত্র যাচাই–বাছাই ছাড়াও আমরা ময়মনসিংহে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিসহ ওই এলাকায়ও কথা বলে পরিচয় নিশ্চিত হয়েছি। সবকিছু যাচাই করে আমরা ওই নারীকে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছি।’