খুলনায় সড়কে ঘুরছে গরুর পাল, ভোগান্তি নগরবাসীর

সড়কে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে গরুর পাল। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। ২৫ আগস্ট খুলনা নগরের নিরালা এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

গরুর পাল ঘুরছে খুলনা নগরের ব্যস্ত সড়কে। কখনো সড়ক বিভাজকের ছোট গাছের পাতা খাচ্ছে, কখনো ফুটপাতে শুয়ে থাকছে। হঠাৎ গরু সামনে চলে আসায় ঘটছে দুর্ঘটনাও। কিন্তু গরুর মালিকেরা গরু সড়কে ছেড়ে দেওয়া বন্ধ করছেন না। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) সম্প্রতি গরুর মালিকদের নোটিশ দিয়েছে। তবে এখনো গরু আটক বা মালিকদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নগরবাসী।

গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টা। খুলনা নগরের নিরালা এসটিএস এলাকায়। হালকা বৃষ্টি পড়ছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা গৃহস্থালির ময়লা সেখানে ফেলা হয়েছে। ময়লার স্তূপ ঘিরে অন্তত ৪০টি গরু। কোনোটি ময়লার মধ্যে খাবার খুঁজছে, কোনোটি দাঁড়িয়ে আছে। গরুর ভিড়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ময়লা ফেলতে বেগ পেতে হচ্ছে। প্রায় এক ঘণ্টা পর গরুগুলো দল বেঁধে নিরালার এসটিএস এলাকা থেকে বের হয়ে সড়কে উঠে পড়ে। পাশ দিয়ে হর্ন বাজিয়ে যানবাহন চললেও গরুগুলো সড়ক ছাড়ছে না। কয়েকটি সড়ক বিভাজকের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, খেতে থাকে গাছের পাতা।

নিরালা এলাকার কাচ্চি নবাব নামের একটি রেস্তোরাঁর কর্মী মো. তুহিন সরদার বলেন, কয়েক দিন আগে কয়েকটি গরু দোকানের সামনে মলত্যাগ করে জায়গাটি নোংরা করে দিয়ে যায়। গরুগুলো ময়লা খাওয়ায় মল থেকেও অনেক দুর্গন্ধ হয়। পরে তাঁরা নিজেরাই জায়গাটি পরিষ্কার করেছেন।

গত বুধবার বেলা তিনটার দিকে খুলনা পিটিআইয়ের প্রধান ফটকের পাশের ফুটপাতেও চার-পাঁচটি গরু শুয়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এসব এলাকায় নিয়মিতই গরু ঘোরাফেরা করে। কয়েকটি গরুর মালিকের পরিচয়ও তাঁরা জানেন। মালিকদের বারবার অনুরোধ করা হলেও সড়কে গরু ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা বন্ধ হয়নি।
রিকশাচালক আবদুস সালাম বলেন, লাইন ধরে চলতে চলতে গরু হঠাৎ ইচ্ছেমতো এদিক-ওদিক চলে যায়। এ জন্য খুব সমস্যা হয়। এ ছাড়া গরুতে গাছগাছালিও নষ্ট করছে।

নিয়মিত ঘোরাফেরা করা গরুর মধ্যে মহসিন নামের এক ব্যক্তির ৪-৫টি, মোহাম্মদ উজ্জ্বলের ৩০-৩৫টি ও সাজিদ নামের আরেক ব্যক্তির কয়েকটি গরু রয়েছে।

শুধু নিরালা ও পিটিআই মোড় নয়, নগরের বয়রা বাজারের মোড়, কবির বটতলা, খালিশপুর বিআইডিসি রোডের পাওয়ার হাউস মোড়, পিপলস গেট মোড়, প্লাটিনাম ২ নম্বর গেট, দৌলতপুর, টুটপাড়া, রেলিগেট, ফুলবাড়ীগেট ও আলমনগর মোড়েও নিয়মিত গরুর বিচরণ দেখা যাচ্ছে।

নিরালা এলাকার অন্তত পাঁচজন বাসিন্দা বলেন, নিয়মিত ঘোরাফেরা করা গরুর মধ্যে মহসিন নামের এক ব্যক্তির ৪-৫টি, মোহাম্মদ উজ্জ্বলের ৩০-৩৫টি ও সাজিদ নামের আরেক ব্যক্তির কয়েকটি গরু রয়েছে। পিটিআই মোড়ে দেখা যাওয়া গরুগুলোর বেশির ভাগই টুটপাড়া ক্রস রোডের ২ নম্বর বালুর মাঠ-দারোগা বস্তি এলাকার বাসিন্দা নীলুর। এসব গরু সড়কে না ছাড়ার জন্য বলা হলেও মালিকেরা তা শুনছেন না।

গরুর মালিক মোহাম্মদ উজ্জ্বল বলেন, ‘কিছুদিন আগে থানা থেকে এসে বলার পরে আমি এখন আর সারা দিন গরু ছাড়ছি না। সকালবেলায় একটু ছেড়ে দেওয়ার পর ঘণ্টা দুয়েক গোয়াল পরিষ্কার করার পরে আবার বেঁধে ফেলি। ওখানে পাঁচ-সাতজনের গরু থাকে; কিন্তু কারও কাছে শুনলে আমার নাম বলে। আপনারা এসে আমার গোয়াল দেখে যেতে পারেন।’

দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলছে। বিষয়টি মেট্রোপলিটন পুলিশ ও সিটি করপোরেশনকে জানানো হয়েছে। তারা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
মাহবুবুর রহমান, সভাপতি, নিরাপদ সড়ক চাই, খুলনা মহানগর শাখা

সড়কে যত্রতত্র গরু ঘোরাফেরা করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। হঠাৎ গরু সামনে চলে আসায় রিকশা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা বিপাকে পড়ছেন। বসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে মলত্যাগ করায় বিড়ম্বনায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। গৃহস্থালির ময়লা সংগ্রহ করে নিরালা এসটিএস এলাকায় ফেলেন একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী আকবর আলী। তিনি বলেন, ‘ময়লা ফেলার জায়গায় ৩০-৪০টি গরু থাকে। হাবিজাবি খায়। আমাদের খুব বিরক্ত করে। ময়লার গাড়ি থেকে ময়লা ফেলার সুযোগ দেয় না। গত রোববার একটি গরু গুঁতিয়ে আমার ময়লার গাড়ির একটি অংশ ভেঙে দিয়েছে।’

নিরালা তাবলিগ মসজিদের কাছে সম্প্রতি দুর্ঘটনার শিকার হন এক নারী শিক্ষক। তিনি বলেন, স্বামীর সঙ্গে মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি গরু দিক পরিবর্তন করে তাঁদের সামনে চলে আসে। গরুটিকে পাশ কাটাতে গেলে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি মোটরসাইকেল তাঁদের ধাক্কা দেয়। এতে তাঁর ও তাঁর স্বামীর হাত-পা কেটে রক্তক্ষরণ হয়।

আবর্জনার স্তূপে খাবার খুঁজে খুঁজে খাচ্ছে গরুর পাল। গত ২৫ আগস্ট খুলনা নগরের নিরালা এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

স্থানীয় লোকজনের দাবি, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে এবং সড়কের গাছের চারা রক্ষা করতে দ্রুত সড়ক থেকে গরু সরাতে হবে। একই সঙ্গে মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ও নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।

সম্প্রতি সড়কে গরু ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে মালিকদের সতর্ক করে নোটিশ দিয়েছে কেসিসি। নোটিশে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কেসিসির রোপণ করা গাছ এসব গবাদিপশুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক বিভাজকের ওপর রোপণ করা গাছ গরু খেয়ে ফেলছে। একই সঙ্গে রাস্তায় গবাদিপশু শুয়ে থাকায় যানবাহন ও জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং অনেক সময় যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ছেড়ে রাখা গবাদিপশু কেসিসির খোঁয়াড়ে আবদ্ধ রেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে কেসিসির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা পেরু গোপাল বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘মালিকদের তথ্য সংগ্রহ করছি। এ বিষয়ে মাইকিং করা হয়নি। তবে গত ২৯ জুলাই সড়কে গরু ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় ১৬ জনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

গরুগুলো বেওয়ারিশ নয় উল্লেখ করে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলছে। বিষয়টি মেট্রোপলিটন পুলিশ ও সিটি করপোরেশনকে জানানো হয়েছে। তারা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।