পাহাড় কাটায় ঠিকাদারের সঙ্গে জরিমানা গুনতে হবে সরকারি দপ্তরকেও

কক্সবাজারের চকরিয়ার হারবাং এলাকায় বনের ভেতর পাহাড় কেটে নির্মিত হচ্ছে সড়ক। সম্প্রতি তোলাছবি-সংগৃহীত

কক্সবাজারের চকরিয়ায় হারবাং সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণ করতে পাহাড় কাটার ঘটনায় ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। গতকাল বুধবার শুনানি শেষে এ অর্থ সাত কর্মদিবসের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

২ অক্টোবর প্রথম আলোয় ‘চকরিয়ায় পাহাড় কেটে সড়ক’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে পাহাড় কাটার প্রমাণ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শুনানিতে ডাকা হয়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের চকরিয়ায় হারবাং সংরক্ষিত বনে দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সড়ক নির্মাণের সময় পাহাড় কাটা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। নির্মাণকাজের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোমিনুল হক।

আদেশে আরও বলা হয়, গতকাল পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে শুনানি হয়। শুনানিতে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী পাহাড় কাটার ঘটনায় পরিবেশগত ক্ষতি নিরূপণ করে ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়।

ক্ষতিপূরণের অর্থ সাত কর্মদিবসের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে। অর্থ জমা না দিলে আদালতে মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ১৪ ধারা ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩–এর বিধি ২৭ অনুযায়ী আপিলের সুযোগের কথাও জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এলজিইডি ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এই অর্থ পরিশোধ করবেন। পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই।

হারবাংয়ের এই সড়ক এলজিইডির ‘দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের কাজ বন্ধ করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকাও পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংরক্ষিত বনে সড়ক নির্মাণ নিয়ে আপত্তি

২ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের উত্তর হারবাং ফরেস্ট অফিস থেকে কোরবানিয়াঘোনা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক নির্মাণ করছে এলজিইডি। সড়কটির নির্মাণে ব্যয় প্রায় ২৫ কোটি ৩ লাখ টাকা। এতে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

বন বিভাগের হিসাবে, সড়কটির প্রায় চার কিলোমিটার পড়েছে গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনের ভেতর। প্রায় শতবর্ষী এই বনে বন্য হাতি চলাচল করে। সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে উত্তর সাবানঘাটা ও উত্তর করমুহুরীপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়–টিলা কাটা হয়েছে। কাটা পড়েছে কয়েকটি গাছও। সড়ক নির্মাণ করা হলে বেশ কিছু মা গাছও কাটা পড়বে।

পাহাড় কাটার বিষয়টি গত ১৭ সেপ্টেম্বর বন বিভাগের নজরে আসে। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর এলজিইডিকে চিঠি দিয়ে সংরক্ষিত বনের ভেতর কাজ বন্ধ করতে বলেন চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবীর হাসান। তবে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পাঁচ দিন পরও সেখানে পাহাড় কাটতে দেখা যায়।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সংরক্ষিত বনের ভেতর পাকা সড়ক হলে মানুষের প্রবেশ ও যানবাহন চলাচল বাড়বে। এতে বনভূমি জবরদখল, গাছ চুরি ও বন্য প্রাণী শিকারের ঝুঁকি তৈরি হবে। বাধাগ্রস্ত হতে পারে হাতির চলাচলও।

প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, হারবাং ছাড়া চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবন, মহেশখালীর শাপলাপুর সংরক্ষিত বন ও সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বনে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে বন বিভাগ আপত্তি জানিয়েছে।