গত শনিবার সকালে বগুড়ার কাহালু উপজেলার দরগাহাটসংলগ্ন কালিয়ার পুকুর এলাকায় বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কে ভাড়ায়চালিত গাড়ি ও বেপরোয়া গতির একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত চারজনের মধ্যে সুমন সরকার একজন। তিনি গাড়িটি চালিয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত এক রোগীকে নিয়ে নওগাঁর ধামুইরহাট থেকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। তাঁর বাড়ি নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার চকদুর্গা রায়াম আদর্শগ্রামে।

গতকাল রোববার কথা হয় সুমন সরকারের ছোট ভাই ট্রাক্টরচালক রাশেদ সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভাইয়ার উপার্জনে গোটা সংসার চলত। তিনি ভাড়ায়চালিত গাড়ি চালাতেন। ভাইয়া মারা যাওয়ার পর থেকে মা শোকে পাথর। ভাবি বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।’

থেমে থেমে কাঁদছিলেন সুমন সরকারের স্ত্রী রিতু আক্তার। তিনি বলেন, ভোরে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার সময় রোগী নিয়ে বগুড়ায় যাওয়ার কথা জানান। সন্ধ্যায় মেয়ের জন্য চকলেট নিয়ে বাড়িতে ফেরার কথা ছিল। অথচ ফিরেছেন লাশ হয়ে।

এদিকে বেপরোয়া গতির সেই ট্রাকের চালক ও সহকারীর ৩৬ ঘণ্টা পরও হদিস মেলেনি। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেন কাহালু থানার উপপরিদর্শক আল আমিন। তবে মামলার এজাহারে ট্রাকের চালক, চালকের সহকারী ও মালিকের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

ট্রাকের মালিকের বিষয়ে তথ্য জানতে বিআরটিএতে চিঠি দেওয়া হবে জানিয়ে কাহালু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমবার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ট্রাক জব্দ দেখানো হয়েছে। তবে ট্রাকের চালক ও সহকারীকে এখনো শনাক্ত করা যায়নি। ট্রাকের মালিকানাও কেউ দাবি করেননি।

১৮ লাখ টাকার হদিস মেলেনি

এ দুর্ঘটনায় নিহত আবদুর রহমান (৩২) বালুর ব্যবসা করতেন। ভাড়া করা ট্রাকে বালু সরবরাহ করতে খরচ বেশি পড়ত। এ কারণে শনিবার ট্রাক কেনার জন্য ১৮ লাখ টাকা নিয়ে ভাড়া করা গাড়িতে করে তিনি বগুড়ায় যাচ্ছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

এদিকে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত তনছের আলীর (৭৫) চিকিৎসা চলছিল বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শনিবার কেমোথেরাপি নিতে তাঁর নওগাঁর ধামুইরহাট পৌর এলাকার জগদল গ্রাম থেকে বগুড়ায় যাওয়ার কথা ছিল। তাঁর ছেলে ফজলে রাব্বির (২৫) বন্ধু আবদুর রহমান।

প্রথমে বন্ধুর অসুস্থ বাবাকে তুলে নিতে শনিবার ভোরে গাড়ি পাঠান আবদুর রহমান। এরপর সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে গাড়িতে ওঠেন আবদুর রহমান ও তাঁর আরেক বন্ধু শাকিল। তবে বগুড়ায় পৌঁছার আগেই সকাল আটটার দিকে কাহালু উপজেলার কালিয়ার পুকুর এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা বেপরোয়া গতির একটি ট্রাকের ধাক্কায় তাঁদের গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে গাড়ির চালক সুমন, যাত্রী তনছের আলী ও তাঁর ছেলে ফজলে রাব্বি ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

আহত আবদুর রহমান ও শাকিলকে উদ্ধার করে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আবদুর রহমানকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর থেকে আবদুর রহমানের ১৮ লাখ টাকার খোঁজ মেলেনি।

জানতে চাইলে গতকাল দুপুরে আবদুর রহমানের বাবা মফিজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসার জন্য কিস্তিতে ট্রাক কিনতে ১৮ লাখ টাকা জোগাড় করেন আবদুর রহমান। এরপর বগুড়ায় যাওয়ার জন্য একটি গাড়ি ভাড়া করেন। ট্রাক কিনতে সঙ্গে নেন ১৮ লাখ টাকা। তনছের আলী ও তাঁর ছেলে ফজলে রাব্বিকেও ওই গাড়িতে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। তবে বগুড়ায় পৌঁছার আগেই সব শেষ হয়ে যায়।

পুলিশ আবদুর রহমানের সঙ্গে থাকা ১৮ লাখ টাকাভর্তি ব্যাগের কোনো সন্ধান দিতে পারেনি জানিয়ে মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘সন্তানকে অকালে হারালাম। তাঁর সঙ্গে থাকা ১৮ লাখ টাকাভর্তি ব্যাগও পাওয়া যাচ্ছে না। কী রকম অসহায় আমরা।’

পুলিশ দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয় জানিয়ে কাহালু থানার ওসি আমবার হোসেন বলেন, পুলিশ সেখানে গিয়ে কোনো টাকার ব্যাগ পায়নি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন