‘সম্পত্তি গেলে যাক, ছেলেকে তো আর বুকে নিতে পারব না’

নিহত শিশু নূর আবদুল্লাহছবি: স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা দক্ষিণ সোনাপাহাড় এলাকায় ছোট একটি ছড়ার পাশে টিলার ওপর টিনের ঘর। বাড়ির আঙিনায় চেয়ার পেতে শোক জানাতে আসা লোকজনের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছিল বিলাপের শব্দ। সেদিকে তাকিয়ে চোখ মুছছিলেন উঠানে বসা স্বজনেরা।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় বড়দের জমির বিরোধে খুন হওয়া শিশু নূর আবদুল্লাহর (৪) বাড়িতে গিয়ে এমন শোকার্ত পরিবেশ দেখা গেল। ময়নাতদন্তের কাজ শেষ না হওয়ায় তখনো আবদুল্লাহর মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা ছিল। ছেলের লাশ হাসপাতালে রেখে গত রাতে বাড়ি ফেরেন মা রুপা আক্তার ও বাবা নুরুল আলম। সকালে ঘরের সামনের কক্ষে নির্বাক বসেছিলেন বাবা নুরুল আলম। ভেতরে আহাজারি করছিলেন রুপা আক্তার। বারবার বলছিলেন, ‘আমার সবকিছুর বিনিময়ে আমার সোনামানিককে এনে দাও। আমার বুকের ধনকে তোমরা এনে দাও।’

আরও পড়ুন

স্বজনেরা জানান, পাঁচ বছর আগে বিয়ে হয় নুরুল আলম ও রুপা আক্তার দম্পতির। বিয়ের এক বছর পর ঘর আলো করে আসে তাঁদের সন্তান নূর আবদুল্লাহ। মা–বাবার পাশাপাশি একান্নবর্তী পরিবারে দাদা-দাদি আর চাচা-জ্যাঠাদের আদরে বড় হচ্ছিল শিশুটি। বড়দের জায়গার বিরোধে গতকাল বুধবার দুপুরে খুন হয় সে।

নুর আবদুল্লাহ হত্যার ঘটনায় আজ সকালে দাদি জোসনা বেগম বাদী হয়ে প্রতিবেশী দ্বীন ইসলামকে প্রধান আসামি করে আটজনের নামে জোরারগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। বাড়ির পাশে বিরোধপূর্ণ জায়গায় ঘর তোলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের ঝগড়ার এক পর্যায়ে প্রতিবেশী দ্বীন ইসলাম নুরুল আলমের শিশুসন্তান নূর আবদুল্লাহর মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করলে তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত দ্বীন ইসলাম ও তাঁর ভাই আরিফুল ইসলাম পলাতক। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তিনজনকে আটক করে থানা হেফাজতে নিয়েছে।

চার বছরের শিশুকে এভাবে হত্যার ঘটনায় স্তব্ধ দক্ষিণ সোনাপাহাড় এলাকার মানুষ। গ্রামে ঢুকতেই আবদুল্লাহদের বাড়ি চিনিয়ে দিলেন কয়েকজন। তাঁদের চোখেমুখে বিষাদের ছায়া। আবদুল্লাহর বাবা নুরুল আলম পেশায় ঢেউটিন ব্যবসায়ী। জায়গার বিরোধ এত দূর গড়াবে তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। কথা বলতে চাইলে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘সহায় সম্পদ চলে গেলে যাক। আমার ছেলেকে আর কখনো বুকে নিতে পারব না।’ বিলাপ করতে করতে বুক চাপড়াতে থাকেন তিনি।

নূর আব্দুল্লার ঘরের সামনে লাশের অপেক্ষায় স্বজনরা। আজ সকাল দশটায়
ছবি: প্রথম আলো

নুরুল আলমের কাছ থেকে জানা গেল, ঘরের পাশের প্রতিবেশী দ্বীন ইসলামের সঙ্গে জায়গা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল তাঁদের। সেই জায়গা নিয়ে আদালতে দুই পক্ষেরই মামলা আছে। বিরোধপূর্ণ জায়গাটিতে কোনো প্রকার স্থাপনা নির্মাণে না করতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল। সে আদেশ অমান্য করে আজ সকাল থেকে দ্বীন ইসলাম ও তাঁর ভাই আরিফুল ইসলাম ঘরের নির্মাণকাজ করছিলেন।

নুরুল আলম বলেন, ‘আমার মা সেখানে গিয়েছিলেন প্রতিবাদ করতে। আমি বাড়িতে ছিলাম না। কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে তাঁরা মায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। একপর্যায়ে দ্বীন ইসলাম লাঠি হাতে আমাদের ঘরের দিকে তেড়ে এসে উঠানের পাশে বসা আমার ছেলের মাথায় আঘাত করেন। এতে তার মাথার পেছনে অংশ থেঁতলে যায়। দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসক ছেলেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর আমার ছেলে মারা যায়।’

জানতে চাইলে জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিশু নূর আবদুল্লাহ হত্যার ঘটনায় তার দাদি জোসনা বেগম বাদী হয়ে দ্বীন ইসলামকে প্রধান আসামি থানায় হত্যা মামলা করেছেন। নিহত শিশুর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে। ঘটনার পর আমরা তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছিলাম। তাঁদের মামলার আসামি করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে।’