কেউ চায় চিকিৎসক হতে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে, সবার চিন্তা পড়ার খরচ

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে থাকছে চার শিক্ষার্থীর কথা।

সাদিকা আক্তার, সানজিনা ইসলাম, মোছা. রুবাইয়া খাতুন রাকা ও সুমাইয়া আক্তার সুমী

অভাবের সংসারে বেড়ে উঠেছে তারা। কারও বাবা নেই, কারও বাবা প্রবাসে গিয়েও কাজ পাননি। কারও পরিবারের সম্বল সামান্য জমি। আবার কারও সংসার চলে মায়ের একার প্রচেষ্টায়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা থামায়নি তারা। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় চারজনই জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ভালো ফলের পর তাদের চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। কেউ চিকিৎসক হতে চায়, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়; কিন্তু কলেজে পড়াশোনার খরচ কীভাবে চলবে, সেই দুশ্চিন্তাও আছে।

স্কুলে একমাত্র সাদিকাই জিপিএ–৫ পেয়েছে

ফরিদপুর শহরের জোহরা বেগম উচ্চবিদ্যালয় থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় মাত্র একজন শিক্ষার্থী জিপিএ–৫ পেয়েছে। তার নাম সাদিকা আক্তার। তার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার; কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হতে হলে প্রচুর খরচ, এ খরচ বহন করার ক্ষমতা তার মায়ের নেই। এ কথা ভেবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বাদ দিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার চিন্তা করছে সাদিকা।

সাদিকা পরিবারের সঙ্গে ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুর এলাকায় থাকে। পাঁচ বছর আগে তার মা–বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তারপর থেকে সাদিকা ও আনিশা দুই মেয়েকে কোলেপিঠে করে গড়ে তোলার সংগ্রামে নামেন মা মোহসিনা বেগম। অভাবের সংসার, দুই মেয়ের জন্য বাবার সামান্য টাকা এবং আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় তিনি দুই মেয়েকে পড়াশোনা করান।

সাদিকা আক্তার বলেন, ‘মা-ই আমাকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আমি জানি, কত অভাব– অনটনের মধ্যে আমাদের চলতে হচ্ছে। গরিব মানুষদের স্বপ্ন দেখাও যেন বিলাসিতা। সংসারের অবস্থা বুঝেই আমি উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগে পড়ার কথা ভাবছি।’

আরও পড়ুন

সাদিকার মা মোহসিনা আক্তার বলেন, আমার মেয়ে স্বপ্ন দেখেছিল চিকিৎসক হওয়ার। এ জন্য রাত–দিন পরিশ্রম করে সে জিপিএ–৫ পেয়েছে; কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে আমার পক্ষে এ ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়। সামনে কী করব বুঝতে পারছি না।

জোহরা বেগম উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ওয়াহিদা খানম বলেন, ‘চলতি বছর এ বিদ্যালয় থেকে সে–ই একমাত্র ছাত্রী, যে জিপিএ–৫ পেয়েছে; কিন্তু আর্থিক কারণে যদি আগামীতে তার পড়াশোনা ব্যাহত হয়, তবে একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন অভিভাবক হিসেবে এ দায় আমরা এড়াতে পারব না।’

অনলাইনে ফ্রি ক্লাস করত সানজিনা

অর্থের অভাবে নিয়মিত প্রাইভেট পড়া সম্ভব হতো না। যে কারণে ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে ফ্রি ক্লাস করত সানজিনা ইসলাম। স্কুলেও ছিল নিয়মিত। কোথাও আটকে গেলেই শ্রেণিশিক্ষকের সহযোগিতা নিত। পাশাপাশি বাড়িতে নিয়মিত পড়াশোনা করত। এভাবেই এসএসসি পরীক্ষায় সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে সানজিনা।

সানজিনা রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড শাকের ফকিরপাড়ার রফিকুল ইসলামের মেয়ে। সে গোয়ালন্দ শহীদ স্মৃতি সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থী ছিল।

রফিকুল ইসলাম হাটের ইজারাদারের আদায়কারী হিসেবে কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে ছোট্ট একটি দোকান করেছিলেন। প্রায় আট মাস আগে ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান; কিন্তু সেখানে এখনো কোনো কাজ পাননি।

রফিকুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তার অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দুই মেয়েকে নিয়ে দিন পার করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভেবেছিলাম, সানজিনার বাবা বিদেশে রোজগার করতে পারলে দেনা শোধ করার পর আমাদের দিন ঘুরে যাবে; কিন্তু এখন একদিকে পাওনাদারের টাকা পরিশোধের চাপ, পাশাপাশি দুই সন্তানের পড়ালেখা চালানো অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।’

সানজিনা ইসলাম বলে, ‘পরিবারের অভাব দূর করতে অনেক কষ্টে বাবা সৌদি আরবে গিয়েও ভালো নেই। মায়ের পক্ষে আমার প্রাইভেটের টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল না। উপায় না পেয়ে বাবার রেখে যাওয়া ফোন দিয়ে ইউটিউব ঘাঁটাঘাঁটি করে পড়াশোনার বিষয় খোঁজ নিতাম, অনলাইনে ফ্রি ক্লাস করতাম।’ ভালো ফল করার পেছনে মায়ের অবদানের কথা তুলে ধরে সানজিদা আরও বলে, ‘গোয়ালন্দ সরকারি কামরুল ইসলাম কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা আছে; কিন্তু পড়াশোনার খরচ চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

মা–বাবার পাশে দাঁড়াতে চায় রুবাইয়া

কৃষক বাবার সম্বল বলতে সামান্য কিছু জমি। সেই জমির ফসলেই চলে সংসার। এর মধ্যেই দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচ জোগাতে হয়। অভাবের এই সংসারে বড় মেয়ে মোছা. রুবাইয়া খাতুন রাকা পড়ালেখায় ভালো ফল করে পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।

রুবাইয়া সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের তবারিপাড়া গ্রামের কৃষক মো. রাসেল হোসেন সরকার ও গৃহিণী মোছা. ছালমা বেগম দম্পতির মেয়ে। সে উপজেলা সদরের ধানগড়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। অভাবের সংসারে মেয়ের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ালেখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে তার পরিবার। এ দম্পতির আরেক সন্তান রেজোয়ান সরকার ধানগড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

রুবাইয়ার মা মোছা. ছালমা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়েটা পড়ালেখায় ছোটবেলা থেকেই ভালো। এসএসসি পরীক্ষাতেও ভালো ফল করেছে। এখন কলেজে পড়ালেখার জন্য খরচ জোগানো নিয়ে আমরা চিন্তায় পড়েছি।’

আরও পড়ুন

রুবাইয়ার ইচ্ছা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো পড়ালেখা করে আরেকটি জিপিএ-৫ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। পড়ালেখা শেষ করে মা–বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দুঃখ দূর করার চেষ্টা করবে।

রুবাইয়ার বাবা কৃষক মো. রাসেল হোসেন সরকার বলেন, সম্বল বলতে সামান্য কিছু জমি। তা চাষ করে সংসার চালানোই কঠিন। তারপর মেয়ে ও ছেলের পড়ালেখার খরচ চালানো খুবই কঠিন।

ধানগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোনাতন কুমার বলেন, ‘রুবাইয়ার মতো অদম্য মেধাবীর পাশে কোনো হৃদয়বান মানুষ সহায়তা নিয়ে দাঁড়াবেন বলে আশা করি।’

প্রয়াত বাবার ইচ্ছাপূরণে সুমাইয়ার সংগ্রাম

বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে-মেয়েদের মধ্যে কেউ একজন চিকিৎসক হবে; কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই অসুস্থ হয়ে মারা যান বাবা। এরপর অভাবের সংসারের হাল ধরেন দুই ভাই। তাঁদের টিউশনির আয়ে চলে মা ও পাঁচ ভাই-বোনের সংসার। সেই সংসারেই বেড়ে ওঠা সুমাইয়া আক্তার সুমী এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

সুমাইয়া শেরপুর সদর উপজেলার হালগড়া ফটিয়ামারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়ি সদর উপজেলার ফটিকমারী গ্রামে। পরিবারের ৬ শতাংশ জমি ছাড়া আর কোনো আবাদি জমি নেই।

সুমাইয়ার বাবা তোফাজ্জল হোসেন পল্লিচিকিৎসক ছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর অসুস্থ থাকার পর সুমাইয়া যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে, তখন তিনি মারা যান। বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন মা শাহিনা বেগম। সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। পরে শাহিনা বেগম তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া ওয়ারিশি জমি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেন। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

সুমাইয়ার বড় দুই ভাই টিউশনি করে নিজেদের পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের খরচও চালান। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। মেজ বোন তাসলিমা ইয়াসমিন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন।

অভাব নিত্যদিনের সঙ্গী হলেও পড়াশোনা থামেনি সুমাইয়ার। সে বলে, ‘বাবার স্বপ্ন ছিল আমাদের মধ্যে যে কেউ যেন চিকিৎসক হয়। আমি চিকিৎসক হয়ে বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চাই; কিন্তু আমাদের যে অবস্থা, তাতে উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে চালাব, সেটিই বুঝতে পারছি না।’

সুমাইয়ার মা শাহিনা বেগম বলেন, ‘সুমাইয়া বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চায়; কিন্তু টাকার অভাবে সেই স্বপ্ন দেখতেও ভয় লাগে। মেয়ের কলেজে পড়াশোনার খরচ চালানো নিয়ে চিন্তায় আছি।’

হালগড়া ফটিয়ামারী উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক এ এইচ মুরাদ বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সুমাইয়া ও তার ভাই-বোনেরা কষ্ট করে পড়াশোনা করছে। সুমাইয়া অত্যন্ত মেধাবী। বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকই তাকে সহযোগিতা করেছেন। উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলে সে ভালো করবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর, প্রতিনিধি, রাজবাড়ী, শেরপুররায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ]

আরও পড়ুন