বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, এবার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া ইলিশের প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা ভালোভাবেই কার্যকর হয়েছে।

ইলিশ গবেষকেরা বলছেন, ইলিশ মূলত সারা বছরই ডিম দেয়। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—এ দুই মাসের চারটি অমাবস্যা-পূর্ণিমায় ডিম পাড়ে। বিশেষ করে অক্টোবরের দুটি অমাবস্যা-পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এ সময়ে ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মা ইলিশ রক্ষা করা, যাতে তারা নিরাপদে নদীতে ডিম ছাড়তে পারে। এই ডিম রক্ষা করতে পারলে তা নিষিক্ত হয়ে জাটকার জন্ম হবে। সেই জাটকা রক্ষা করা গেলে দেশে বড় আকারের ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর প্রতিবছর ২ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন—এই ৮ মাস জাটকা ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। দুই ধাপের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে ইলিশ উৎপাদন যেভাবে বেড়েছে, তেমনি ওজন-আকারেও বেড়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, বাংলাদেশে ২০০৩-০৪ সাল থেকেই জাটকা রক্ষার কর্মসূচি শুরু করা হয়। তখন থেকেই ধীরে ধীরে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছিল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ রক্ষায় সরকার ও মৎস্য বিভাগ এবং জেলে ও ব্যবসায়ীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি যত্নশীল। আগে ইলিশ সংরক্ষণ, এর জীবনাচার নিয়ে দেশে তেমন কোনো গবেষণা, পরিকল্পনা ছিল না। এখন নানামুখী কাজ হচ্ছে, গবেষণা করে নতুন নতুন তথ্য উদ্‌ঘাটন করা হচ্ছে। এসব তথ্য যাচাই করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইলিশের অভয়াশ্রম বাড়ানো হয়েছে। মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং জাটকা ধরায় আট মাসের নিষেধাজ্ঞা কড়াকড়িভাবে মানা হচ্ছে। এ সময়ে জাটকা ও মা ইলিশ ধরা প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ফলে ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারছে। ফলে পোনা ও জাটকা বেড়ে ওঠার পরিবেশ পাচ্ছে। দেশের নদ-নদীতে সারা বছর ইলিশ মিলছে। একইভাবে সাগরে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞাও সুফল দিচ্ছে।

মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের হিসাবে, বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ এখন বাংলাদেশে আহরিত হচ্ছে। বাংলাদেশের পরই ইলিশের উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে আছে ভারত। ৫ বছর আগে দেশটিতে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ ইলিশ উৎপাদিত হতো। তবে গত বছর তাদের উৎপাদন প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশে নেমেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা মিয়ানমারে উৎপাদিত হয়েছে ৩ শতাংশের মতো। ইরান, ইরাক, কুয়েত ও পাকিস্তানে উৎপাদিত হয়েছে বাকি ইলিশ।

২০১৬ সালে মৎস্য অধিদপ্তর ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী গবেষণা করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ইলিশের সর্বোচ্চ টেকসই উৎপাদন ৫ লাখ ৩০ হাজার টন হতে পারে। কিন্তু সেই পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হয়েছে। চার বছরেই ইলিশের উৎপাদন সর্বোচ্চ ওই সীমা অতিক্রম করে গেছে। গত বছর দেশে সাড়ে ৫ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল। এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ টন।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার বলেন, এবার ইলিশের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ টন। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। দেশে মোট ইলিশের ৬৬ ভাগই বরিশাল বিভাগের ৬ জেলা থেকে আহরিত হয়।