গাজীপুরে দুই মহাসড়কে তীব্র যানজটে নাকাল যাত্রীরা, বৃষ্টিতে বেড়েছে দুর্ভোগ
স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করতে মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন চাকরিজীবী হামিদুর রহমান। গন্তব্য রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার গ্রামের বাড়ি। সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্যরাও। কিন্তু ঈদযাত্রার সেই আনন্দ খুব দ্রুতই পরিণত হয় দীর্ঘ ভোগান্তিতে।
গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। হামিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা ছাড়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই যানবাহনের ধীরগতি। এরপর একের পর এক যানজট। কখনো কয়েক শ মিটার এগোতে লেগেছে দীর্ঘ সময়, আবার কোথাও দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে এক ঘণ্টার বেশি। সময় গড়িয়েছে; কিন্তু পথ যেন শেষ হচ্ছে না।
পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিকে কেন্দ্র করে ঘরমুখী মানুষের চাপ বাড়ায় গাজীপুরের প্রধান দুই মহাসড়ক ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে তেমন যানজট নেই। তবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে গাড়ির চাপ রয়েছে। এ কারণে থেমে থেমে চলছে যানবাহন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশ ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কিছু এলাকায় যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। মহাসড়কগুলো ঘুরে খবর পাঠিয়েছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা—
গাজীপুরের দুই মহাসড়কে তীব্র যানজট
আজ দুপুরের পর থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। একদিকে দীর্ঘ যানজট, অন্যদিকে পরিবহন সংকট—সব মিলিয়ে মহাসড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত দুর্ভোগ। রাত আটটা পর্যন্ত দুই মহাসড়কেই তীব্র যানজট ছিল বলে জানিয়েছে গাজীপুর ট্রাফিক পুলিশ।
ঢাকার জিগাতলা থেকে পরিবার নিয়ে দুপুর ১২টায় গাড়িতে করে গ্রামের বাড়ি বগুড়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন আশিষ উর রহমান। সন্ধ্যা ৭টায় তিনি পৌঁছান চন্দ্রায়। এই সাত ঘণ্টায় তিনি গাড়িতে করে যেতে পেরেছেন মাত্র ৪৮ কিলোমিটার পথ। আশিষ বলেন, ১৫ বছর ধরে ঈদের সময় গাড়িতে করে পরিবার নিয়ে বাড়ি যান। এমন অব্যবস্থাপনা কখনো তাঁর চোখে পড়েনি। বাইপাইল থেকে যানজট তীব্র হয়েছে। চন্দ্রায় এসে এখন গাড়ি কোনো দিকে যাচ্ছে না। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় ভোগান্তি পোহাচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশ ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ভোগড়া থেকে চন্দ্রা এবং চন্দ্রা থেকে টাঙ্গাইলের দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রপুর পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে চন্দ্রা থেকে নবীনগর সড়কের জিরানি বাজার পর্যন্ত যানজটে স্থবির হয়ে ছিল। এতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া, বোর্ডবাজার, চান্দনা চৌরাস্তা, সালনা, ভবানীপুর হয়ে মাওনা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার এলাকায় থেমে থেমে যান চলাচল করছে।
বগুড়ায় পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে যাচ্ছেন কারখানার শ্রমিক মো. সজীব। তিনি বলেন, ‘কারখানায় দুপুর ১২টার পর ছুটি হয়েছে। ভেঙে ভেঙে চন্দ্রা পর্যন্ত এসেছি। কিন্তু এখানে এসে আবার যানজটে আটকে গেছি। গাড়িও পাচ্ছি না। কীভাবে বাড়ি যাব, সেই চিন্তায় আছি।’
আরেক যাত্রী হোসেন আলী বলেন, ‘কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর উড়ালসড়ক পার হতে দেড় ঘণ্টা লেগেছে। এখন পুরো সড়কই স্থবির হয়ে আছে। কতক্ষণ এ অবস্থা থাকবে, বলা যাচ্ছে না।’
নাওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম বলেন, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ মহাসড়কে আসায় যানজট তৈরি হয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করছে।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গাড়ির দীর্ঘ সারি
ঈদ উপলক্ষে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় গতকাল সোমবার ধাপে ধাপে ছুটি শুরু হয়েছে। কারখানা ছুটির পর থেকে কারখানার শ্রমিকসহ অন্যরা পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিজ নিজ বাড়িতে ছুটছেন। এতে সাভার উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাসস্ট্যান্ডগুলোতে ঘরমুখী যাত্রীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
আজ সকালের ঝোড়ো বৃষ্টি ও পরে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। এ ছাড়া নবীনগর, পলাশবাড়ী এলাকায় মহাসড়কের ওপর আগে থেকে শ্রমিকদের ভাড়া করা বাস এলোমেলোভাবে দাঁড় করিয়ে রাখায় নবীনগর থেকে বাইপাইল এলাকা পর্যন্ত পরিবহনগুলো চলছিল থেমে থেমে।
দিনের বেলায় পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে নবীনগর ও বাইপাইল এলাকায় ভোগান্তিতে পড়েন ঘরমুখী যাত্রীরা। রাত আটটার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিশমাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে নবীনগর এবং নবীনগর থেকে বাইপাইল এলাকায় গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। গাড়িগুলোকে কিছু সময়ের জন্য থেমে থেমে ধীরগতিতে চলতে দেখা যায়।
নারায়ণগঞ্জের দুই মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক
ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে দুপুরের পর যান চলাচল স্বাভাবিক দেখা গেছে। সকালে যানবাহনের চাপ শুরু হওয়ার পর সোনারগাঁয়ে শ্রমিকদের অবরোধের কারণে কিছুক্ষণের জন্য যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের বেতন ও ওভারটাইমের দাবিতে সোনারগাঁ উপজেলার চৈতি নিট কম্পোজিট কারখানার শ্রমিকেরা দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও মৃদু লাঠিপেটা করে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। অন্যদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কম দেখা গেছে। কোথাও বড় ধরনের যানজটের খবর পাওয়া যায়নি।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি শামীম শেখ প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক আছে। কোথাও বড় ধরনের যানজট নেই। ভোগান্তি ছাড়াই মানুষ স্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
সরাইলে বেড়েছে গাড়ির চাপ, চলছে থেমে থেমে
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৩৪ কিলোমিটার অংশে গাড়ির চাপ বেড়েছে। আশুগঞ্জ গোলচত্বর থেকে সিলেটমুখী অংশে খানাখন্দের কারণে যানবাহনকে ধীরে চলাচল করতে হচ্ছে। আজ কোথাও তেমন কোনো যানজট দেখা না গেলেও গর্তের কারণে সরাইল বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বরকেন্দ্রিক ভোগান্তি নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দিনভর মহাসড়ক ঘুরে দেখা গেছে, সরাইল বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বরের চার দিকে খানাখন্দে ভরা। এসব খানাখন্দে গতকাল ও আজকের বৃষ্টির পানি জমেছে। অন্যদিকে মহাসড়কের তিন দিকে অর্ধশতাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও যাত্রীবাহী বাস দাঁড় করে রাখা।
সরাইল বিশ্বরোড মোড়টি ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের সংযোগস্থল। বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বরে যানবাহনগুলোকে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। এ জন্য কিছুক্ষণ পরপর যানজট লাগছে। কখনো কখনো যানজট গোলচত্বরের তিন দিকে তিন থেকে চার কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা পর্যন্ত এ চিত্র দেখা গেছে।
সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় হাইওয়ে পুলিশের সিলেটে অঞ্চলের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রেজাউল করীমকে সরাইল বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বরে অবস্থান করতে দেখা যায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বর খানাখন্দ ও কাদা পানিতে ভরা। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই যান চলাচল করছে। তাঁরা যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন।
যমুনা সেতুতে দুই দফায় একমুখী যান চলাচল
ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে গাড়ির চাপ বাড়লেও যানজট নেই। তবে অতিরিক্ত চাপে কোথাও কোথাও ধীরগতিতে চলছে যানবাহন। যানজট এড়াতে আজ যমুনা সেতুর উভয় লেন দিয়েই দুই দফায় উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন পার করানো হয়। আগের দিনের তুলনায় মঙ্গলবার যানবাহনের চাপ বেশি দেখা গেছে।
সন্ধ্যায় মহাসড়কের মির্জাপুরের পাকুল্যা থেকে কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, বাসের পাশাপাশি ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান, মোটরসাইকেলে বাড়ির দিকে ছুটছেন মানুষ। পাকুল্যা, নাটিয়াপাড়া, টাঙ্গাইল শহর বাইপাসের আশেকপুর মোড় ও রাবনা মোড়, এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে অনেক যাত্রীকে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
টাঙ্গাইল শহর বাইপাসের রাবনা মোড়ের বাসযাত্রী আশিকুর রহমান জানান, ঢাকা থেকে চার ঘণ্টায় টাঙ্গাইলে এলেন। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সময় লেগেছে। একমাত্র চন্দ্রা এলাকা ছাড়া কোথাও যানজটে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়নি। তবে যানবাহনের চাপের কারণে তাঁদের বাস ধীরগতিতে চলেছে।
এদিকে যানবাহনের চাপ কমাতে আজ দুই দফায় প্রায় তিন ঘণ্টা উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী যানবাহন পারাপার বন্ধ রাখা হয়। এ সময় উভয় লেন দিয়ে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন পার করানো হয়। এতে যানবাহনের চাপ কমে আসে।
যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানায়, মহাসড়কের পুরোটাই চার লেনের সুবিধায় যানবাহন চলাচল করতে পারছে। কিন্তু সেতু দুই লেনের হওয়ায় যানজট পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এ জন্য প্রথম দফায় সকাল ৯টা ৫৩ মিনিট থেকে ১১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট এবং দ্বিতীয় দফায় বিকেল ৪টা ২৭ মিনিট থেকে ৫টা ২৬ মিনিট পর্যন্ত ৫৯ মিনিট উভয় লেন দিয়ে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন পার করানো হয়।
সেতুর টোল প্লাজা সূত্র জানায়, গত রোববার রাত ১২টা থেকে সোমবার রাত ১২টা পর্যন্ত ৫৩ হাজার ২৪৬টি যানবাহন সেতু পারাপার হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন পারাপার হয়েছে ৩২ হাজার ১৮৬টি। আর উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার দিকে গেছে ২১ হাজার ৬০টি যানবাহন। এসব যানবাহন পারাপার করে ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫৮ হাজার ২০০ টাকা টোল আদায় হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় ১৩ হাজার ৩২৭টি গাড়ি বেশি পারাপার হয়েছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার ও টাঙ্গাইল এবং প্রতিনিধি, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া]