রেলস্টেশনে বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ ববি বেগম নিহত হওয়ার ঘটনায় ৫ জন গ্রেপ্তার
নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার হয়ে বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ ববি বেগম (৭০) নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাঈদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার পাঁচজন হলেন সাকিব মিয়া (২৩), ইলিয়াছ মিয়া (৩৫), বিল্লাল মিয়া (২৫), দ্বীন ইসলাম (২৬) ও রিফাত মিয়া (২০)। তাঁদের মধ্যে দ্বীন ইসলাম ও রিফাত মিয়াকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর অন্য তিনজনকে মেথিকান্দা রেলস্টেশনের আশপাশ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
এর আগে গত শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে রেলস্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা ববি বেগমকে মারধরের পর তাঁর দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলায় তাঁর চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
রেলওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার বাক্প্রতিবন্ধী ববি বেগমের ঘটনা দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছে। এ ঘটনায় ভৈরব রেলওয়ে থানায় মামলা হওয়ার পর থেকে আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছিল। ঘটনাস্থল ও আশপাশের কিছু সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর গতকাল সকাল থেকে ভৈরব রেলওয়ে থানা পুলিশ, নরসিংদীর র্যাব–১১ ও রেলওয়ে গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অভিযানে নামে। বিকেলে স্টেশনের আশপাশ থেকে তিনজন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রেলওয়ে পুলিশ স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই যুগ আগে এক দুপুরে এই স্টেশনে থামা একটি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী ববি বেগম। এরপর আর কোথাও যাননি, স্টেশনটির পরিত্যক্ত একটি কক্ষ ছিল তাঁর আশ্রয়। বিনা বেতনে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন তিনি। স্টেশন ও আশপাশের মানুষসহ অনেক যাত্রী তাঁকে চিনতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউ ৫ থেকে ১০ টাকা দিয়ে সহযোগিতা করতেন। ওই টাকা খরচ না করে দুই যুগ ধরে জমিয়েছিলেন।
শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে ওই কক্ষে ববি বেগম ঘুমিয়ে ছিলেন। ওই সময় হঠাৎ কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাঁর কক্ষে ঢুকে জমানো টাকা তাদের হাতে তুলে দিতে বলে। এতে রাজি না হওয়ায় এই বৃদ্ধার চোখ–মুখে কিল–ঘুষি ও সারা শরীরে উপর্যুপরি মারধর করা হয়। পরে তাঁর দীর্ঘদিনের জমানো টাকা খুঁজে বের করে ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর তিন দিন পর মঙ্গলবার রাতে অসুস্থবোধ করলে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্সে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
পরদিন বুধবার সকাল ৯টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে রাত আটটার দিকে তাঁর লাশ স্টেশন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। রাত ১০টায় স্টেশনের প্রবেশমুখে খোলা চত্বরে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁর লাশ স্টেশনসংলগ্ন একটি সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।