বন্ধুকে মারতে বাধা দেওয়ায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে জখম, নেপথ্যে কোন্দল

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তুহিন দর্জি
ছবি: সংগৃহীত

মাদারীপুরে কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা তুহিন দর্জির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার শিকার হন তিনি। পুলিশ বলছে, যাঁরা হামলা করেছেন, তাঁরা সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মী। তাঁরা শহরের একটি ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ন্ত্রণ করেন। হামলার ঘটনায় পুলিশ পাঁচ থেকে ছয়জনকে চিহ্নিত করলেও আজ শনিবার দুপুর পর্যন্ত তাঁদের কাউকে আটক করেনি।

এদিকে চিকিৎসকের বরাতে তুহিনের স্বজনেরা জানিয়েছেন, তুহিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে। তাঁর পা, পিঠ ও মাথায় ধারালো অস্ত্রের গুরুতর আঘাত লেগেছে। তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

গতকাল শুক্রবার রাত আটটার দিকে মাদারীপুর সদর উপজেলার কুলপদ্বী জোড়াব্রিজ এলাকায় তুহিন দর্জিকে (৩৫) কুপিয়ে গুরুতর জখম করে একদল দুর্বৃত্ত। মাদারীপুর ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রাত ১০টার দিকে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

আহত তুহিন দর্জি সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাকির দর্জির ছেলে। তিনি জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের মাদারীপুর জেলা শাখার সভাপতি। ২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ছাগল চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার ও কারাগারে যাওয়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোচিত হয়েছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন
তুহিন দর্জি
ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কুলপদ্বী এলাকার প্রভাবশালী রুবেল ও সোহেল খানের ভাতিজা সজীব ও রাজীব খান এবং শহরের ইটেরপুল এলাকার তুহিন দর্জি ও তাঁর বন্ধু শিমুল সরদার মিলে আলাদা দুটি ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। তাঁদের মধ্যে সজীব ও রাজীব দুই ভাই এবং তুহিন ও শিমুল বন্ধু। রাজীব ও তুহিন সদর উপজেলা ছাত্রলীগের একাংশের সহসভাপতি ছিলেন। কিশোর গ্যাংয়ের গ্রুপ দুটি স্থানীয় সংসদ সদস্য শাজাহান খানের অনুসারী। একই পক্ষের রাজনীতি করলেও গ্যাংয়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আছে। ওই কোন্দলের জেরে তুহিনের ওপর হামলা করেন সজীব ও রাজীব গ্যাংয়ের সমর্থকেরা।

পুলিশ, এলাকাবাসী ও তুহিনের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যায় শহরের ইটেরপুল এলাকা থেকে বন্ধু শিমুল সরদারের সঙ্গে মোটরসাইকেলে পাশের কুলপদ্বী এলাকায় একটি সালিসে গিয়েছিলেন তুহিন। সেখান থেকে শহরে ফেরার পথে কুলপদ্বী জোড়াব্রিজ এলাকায় মোটরসাইকেলের গতি রোধ করে তাঁদের ওপর হামলা করেন রাজীব-সজীব ও তাঁদের লোকজন। হামলাকারীরা দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তুহিনের বন্ধু শিমুল সরদারকে কোপাতে যান। তখন হামলাকারীদের বাধা দেন তুহিন। এ সময় শিমুল কৌশলে পালিয়ে গেলে হামলাকারীরা তুহিনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। তাঁর চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান। পরে তাঁকে উদ্ধার হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তুহিনের চাচা খলিলুর রহমান দর্জি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তুহিনের অবস্থা ভালো না। ওর পায়ের মাংস ও হাড় সরে গেছে। যারা ওরে কোপাইছে, তারা আমাদের জাতশত্রু নয়, সবাই এক দলের রাজনীতি করা লোক। তবু তুহিনকে কেন কোপানো হলো, আমরা স্পষ্ট নই। তবে তুহিনের সঙ্গে থাকা ওর বন্ধু শিমুলকে প্রথমে কোপাতে যায়। শিমুল পালালে তুহিনকে কোপায়। তুহিন হামলাকারী সজীব খান, রুবেল খানসহ পাঁচ থেকে ছয়জনের নাম পুলিশকে বলেছে। আমরা এখনো থানায় লিখিত অভিযোগ দিইনি।’ তবে তাঁরা মামলা করবেন বলে তিনি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সজীব খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘তুহিনের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। তুহিনের বন্ধু শিমুল দুই বছর আগে লোকজন নিয়ে আমাকে কোপায়। আমরা মূলত শিমুলকে ধরতে গিয়েছিলাম। তখন তুহিন মাঝে এসে বাধা দেয়, ধাক্কাধাক্কি করে। এ সুযোগে শিমুল পালায়। এ কারণে বিক্ষুব্ধ কিছু লোক উত্তেজিত হয়ে তুহিনের ওপর হামলা করে। পরে আমরাই তাঁদের সরিয়ে দিই।’

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, পূর্বশত্রুতা, নিজেদের মধ্যে কোন্দলসহ নানা কারণে তুহিনের ওপর হামলা হতে পারে। পুলিশ হামলাকারীদের চিহ্নিত করেছে। যাঁরা হামলা চালান, তাঁরা কুলপদ্বী এলাকার একটি গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রক। তাঁদের ধরার চেষ্টা চলছে। তবে তুহিনের পরিবার এখনো থানায় লিখিত অভিযোগ করেনি। অভিযোগ করলে মামলা নেওয়া হবে।