পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর) ও পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) আসন দুটি প্রথমবারের মতো দখলে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধান চার হাজারের কম। দুটি আসনেই বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। এ কারণেই বিএনপির প্রার্থীদের কপাল পুড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার ও দলীয় নেতা-কর্মীদের অনেকে।
যদিও ভোটের এই ফলাফল মেনে নেয়নি বিএনপি। দুটি আসনেই ভোট পুনর্গণনার দাবিতে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) লিখিত আবেদন করেছেন বিএনপির দুই প্রার্থী। তাঁরা বলছেন, দুটি আসনেই ভোট গণনায় গরমিল করা হয়েছে।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পাবনা-৩ আসনে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ আলী আছগর ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম বিএনপির কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সভাপতি হাসান জাফির পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ২০৬ ভোট। আসনটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ৩৮ হাজার ২৭ ভোট। আসনটিতে অন্য প্রার্থীদের ভোটের অঙ্ক দুই হাজারের নিচে।
বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, হাসান জাফিরের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর বিপক্ষে দাঁড়ান চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসাদুল ইসলাম এবং জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা হাসানুল ইসলাম। এই তিন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সমর্থকেরা নিয়মিত বিক্ষোভ সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি করেন। প্রার্থী পরিবর্তন না হলে তিনজনের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন বলে ঘোষণা দেন। শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পরিবর্তন না হওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হন আনোয়ারুল ইসলাম। ফলে বিএনপির ভেতরেও বিভক্তি দেখা দেয়। তৃণমূল নেতা-কর্মীরাও বিভক্ত হয়ে নির্বাচনের মাঠে কাজ করেন।
স্থানীয় ভোটাররা বছলেন, দুটি আসনেই বিএনপি বেশ কিছুদিন ধরে বিভক্ত। ফলে দলের নেতা-কর্মীরাও দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন। দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি অনেকেই বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন করেছেন। ফলে বিএনপির ঘর থেকে বেশ কিছু ভোট চলে গেছে। এতেই বিএনপির এই পরাজয় হয়েছে। ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ না থাকলে ভোটের ফল অন্য রকম হতে পারত বলে মনে করছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
এদিকে পাবনা-৪ আসনে মোট প্রার্থী ছিলেন সাতজন। তাঁদের মধ্যে জামায়াতের মো. আবু তালেব মণ্ডল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৭৫ ভোট। আসনটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু পেয়েছেন ২৭ হাজার ৯৭০ ভোট। এ আসনটিতেও অন্য প্রার্থীদের ভোটের অঙ্ক দুই হাজারের নিচে।
দুটি আসনেই ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, বিগত কোনো নির্বাচনেই আসন দুটিতে জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচিত হতে পারেননি। এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের হয়েছে, তবে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে বিজয়ী জামায়াত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান খুবই কম।
এদিকে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই ভোট গণনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির দুই প্রার্থী। তাঁদের দাবি, দুটি নির্বাচনী এলাকাতেই ভোট গণনার তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা গেছে, বাতিল ভোটের সংখ্যা অস্বাভাবিক ছিল, অনেক ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের কাছ থেকে জোর করে ফলাফল শিটে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের হিসাবে গরমিলসহ বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পাবনা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘দলীয় কিছু ব্যক্তির অসহযোগিতা ছিল। এরপরও সাধারণ মানুষ বিএনপির ধানের শীষেই ভোট দিয়েছেন। তবে অন্যদিকে ভোট গণনায় জালিয়াতি করা হয়েছে। আমরা এই ফলাফল মানি না। ভোট পুনর্গণনার দাবি করি।’
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মাসুদ খন্দকার বলেন, ‘ভোটের ফলাফল দেখলেই তো বোঝা যাচ্ছে দলীয় বিদ্রোহ না থাকলে বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হতো। বিদ্রোহী দুই প্রার্থীকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’