দাঁড়িপাল্লায় ভোট চেয়ে বক্তব্য দেওয়া আওয়ামী লীগ নেতা যোগ দিলেন বিএনপিতে

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতাকে ফুল দিয়ে বিএনপিতে বরণ করে নেওয়া হয়। গতকাল রোববার বিকেলে চৌদ্দগ্রামের মিয়া বাজার লতিফুন্নেছা উচ্চবিদ্যালয় মাঠেছবি: প্রথম আলো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর প্রথম দিন কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনী সমাবেশে স্থানীয় একজন আওয়ামী লীগ নেতা বক্তব্য দিয়েছিলেন। তাহের নিজেই ওই আওয়ামী লীগ নেতাকে ‘স্বাগত’ জানিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেন। এ নিয়ে তখন তীব্র সমালোচনা ও আলোচনা হয়েছিল।

এবার সেই আওয়ামী লীগ নেতা একই আসনে বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদার নির্বাচনী জনসভায় উপস্থিত হয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এ সময় তাঁকে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ নেতার দাবি, তিনি আগে বিএনপি করতেন, এখন ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছেন’।

আওয়ামী লীগের এই নেতার নাম সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার। তিনি উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। সালাউদ্দিন আহমেদ ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান।

গতকাল রোববার বিকেলে চৌদ্দগ্রামের মিয়া বাজার লতিফুন্নেছা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় উজিরপুর ইউনিয়ন বিএনপি আয়োজিত কামরুল হুদার নির্বাচনী জনসভায় এমন ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

এর আগে গত ২২ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর প্রথম দিনে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের ছুফুয়া বাজার এলাকায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর নির্বাচনী সমাবেশে ওই আওয়ামী লীগ নেতা বক্তৃতা করেন। সেখানে আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন তিনি।

চৌদ্দগ্রামে জামায়াতের প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তৃতা করেন কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার (ডানে)।
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

দলীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল বিকেলে চৌদ্দগ্রামের মিয়া বাজার লতিফুন্নেছা উচ্চবিদ্যালয়ে মাঠে স্থানীয় উজিরপুর ইউনিয়ন বিএনপি কামরুল হুদার সমর্থনে নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করে। একপর্যায়ে মঞ্চে আসেন আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার। তিনি প্রথমে উপজেলা বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা কাজী নাছিম এবং পরে কুমিল্লা-১১ আসনের প্রার্থী কামরুল হুদাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপর কাজী নাছিম ও কামরুল হুদা দুটি ফুলের মালা পরিয়ে ওই আওয়ামী লীগ নেতাকে বরণ করে নেন। এরপর মঞ্চে ঘোষণা করা হয় ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে, তিনি নিজেই বিস্তারিত কথা বলছেন।

আরও পড়ুন

পরে প্রায় পাঁচ মিনিট বক্তৃতা করেন সালাউদ্দিন। বক্তৃতা শেষে মঞ্চে থাকা বিএনপি নেতারাসহ সবাই হাততালি দিয়ে সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারকে স্বাগত জানান।

আজ সোমবার দুপুরে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টা অনেকটা “ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছি” এ রকম। আমি বিএনপির লোক। বিএনপির সঙ্গে ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব। মধ্যখানে আমাকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ দিয়েছিল, কিন্তু আমি আওয়ামী লীগে যোগ দেইনি।’

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী কামরুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সালাউদ্দিন আহমেদ আগে বিএনপি করতেন। গতকাল আমাদের নির্বাচনী সভায় এসেছেন, এটাই আমি জানি। এর বাইরে কিছু বলতে পারব না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়া বাজার এলাকা থেকে সালাউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর ছেলে ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নেয়ামত উল্লাহ মজুমদারকে গ্রেপ্তার করে চৌদ্দগ্রাম থানা-পুলিশ। পরদিন তাঁদের বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে চৌদ্দগ্রামে আটজনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় হওয়া একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

থানা-পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুর এলাকায় আট বাসযাত্রীকে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১১ সেপ্টেম্বর মো. আবুল খায়ের নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে এ ঘটনায় কুমিল্লার আদালতে একটি মামলা করেন।

মামলার আসামির তালিকায় সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, তৎকালীন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, র‍্যাবের তৎকালীন ডিজি বেনজীর আহমেদ, কুমিল্লার তৎকালীন পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তীসহ ১৩০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় ৫০ থেকে ৬০ জনকে। এ মামলায় সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার ১১ নম্বর আসামি এবং তাঁর ছেলে নেয়ামত উল্লাহ মজুমদার ৭৯ নম্বর আসামি। মামলা হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের এই দুই নেতা আত্মগোপনে ছিলেন। এরপর তাঁদের গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয়। এর কিছুদিন পর দুজনে জামিনে মুক্তি পান। বর্তমানে তাঁরা এলাকায় প্রকাশ্যে আছেন।