সুনামগঞ্জে ঝলমলে রোদ, ধান নিয়ে মহা ব্যস্ত কিষান–কিষানিরা

দেখার হাওরের খলায় ধান শুকানোয় ব্যস্ত সময় কাটছে কিষানি সুফিয়া বেগমের। পরিবারের অন্য সদস্যরাও এ কাজে নেমেছেন। আজ বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ইসলামপুর এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

সুনামগঞ্জে সকাল থেকেই ছিল ঝলমলে রোদ। আজ বুধবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোদের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। টানা বৃষ্টির দুর্যোগ-দুর্ভোগের পর এমন রোদে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন কিষান–কিষানিরা। তাঁরা ধান তোলা ও শুকানোয় মহা ব্যস্ত সময় পাড় করেছেন।

কৃষকেরা বলছেন, এভাবে আরও তিন থেকে চার দিন রোদ পাওয়া গেলে হাওরের কাটা ও মাড়াই করা ধান শুকানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে যেসব জমির ধান তলিয়ে যায়নি, সেগুলো কাটা যাবে। তবে যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে ধান শুকাতে ভোগান্তি বাড়বে।

জেলার আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কোনো বৃষ্টি হয়নি। জেলার সুরমা, কুশিয়ারাসহ অন্য নদ-নদীর পানি কিছুটা কমেছে। আগামী তিন দিন পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।

আরও পড়ুন

আজ সকালে হাওরের খলায় আসেন কিষানি সুফিয়া বেগম (৪৫)। আগের দিন কিছু ধান শুকিয়েছেন, কিন্তু খলায় জায়গা কম থাকায় আরও অনেক ধান রয়ে গেছে। সেই ধান বিছিয়ে দিয়েছেন। কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়েই তিনি সেই ধান বিছিয়ে দিচ্ছিলেন। আবার কিছুক্ষণ পর সেই ধান থেকে চিটা ছাড়াচ্ছিলেন বাতাসে উড়িয়ে। সঙ্গে তাঁর দুই মেয়েও কাজে যোগ দিয়েছেন।

সুফিয়া বেগমের বাড়ি সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে। কাজের ফাঁকে তিনি বলেন, ‘আগের কয় দিন বড় খারাপ গেছেল। কোনো কাজ করতে পারছি না। এখন দুইটা দিন ভালো পেয়েছি। যা পারি, তাড়াতাড়ি ধান শুকাতে হবে। কোন সময় মেঘ শুরু হয়, ইটার ঠিক নাই।’

আজ দুপুরে সদর ইসলামপুর গ্রামের ওই খলায় গিয়ে দেখা যায়, ধান শুকাতে ব্যস্ত কৃষক পরিবারের প্রায় সব বয়সী লোকজন। কিষান-কিষানিদের সঙ্গে এ কাজে যোগ দিয়েছে ঘরের শিশুরাও। কেউ ধান বাতাসে উড়িয়ে চিটা ছাড়াচ্ছে, কেউ সেই ধান বিছিয়ে দিচ্ছে খলায়। ঘুরে ঘুরে সেই ধান নাড়ছিলেন নারীরা। আবার শুকনা ধান বস্তায় ভরে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন কেউ কেউ। প্রচণ্ড রোদে কাজের পর ছোট ছোট খুপরি ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন অনেকে।

ধান সেদ্ধ করছেন এক কিষানিরা। ছবি: প্রথম আলো
ছবি: প্রথম আলো

সুনামগঞ্জে এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। গত সোমবার থেকে দিনে বৃষ্টি না হওয়ায় হাওরের খলাগুলোতে চিরচেনা বৈশাখী আমেজ ফিরেছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে বৈশাখজুড়ে হাওরের খলাগুলোতে ধান তোলার উৎসব লেগে থাকে। কিন্তু এবার সেটি হয়নি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে টানা কয়েক দিন হাওরেই নামতে পারেননি কৃষকেরা। এতে অনেক হাওরের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়।

হাওরপারের ইছাগড়ি গ্রামের কৃষক মকব্বির আলী (৬০) বলেন, এখন আর পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া জমির ধান নিয়ে তাঁরা চিন্তা করছেন না। এখন চিন্তা হচ্ছে কাটা ও মাড়াই করা ধান কীভাবে দ্রুত শুকানোর পর গোলায় তোলা যায়, সেটা নিয়ে।

সুনামগঞ্জে এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। গত ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয় অতিবৃষ্টি, নামে উজানের পাহাড়ি ঢল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে টানা কয়েক দিন হাওরেই নামতে পারেননি কৃষকেরা। এতে অনেক হাওরের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে হাওরে ফসল। কমবেশি সব হাওরেই ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখন সোমবার থেকে রোদ ওঠায় মানুষ পুরোদমে হাওরে নেমেছেন।

আরও পড়ুন

৭২ শতাংশ ধান কাটা শেষ, তথ্য নিয়ে বিতর্ক

কৃষি বিভাগের হিসাবে সুনামগঞ্জে চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা ৭২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল নেই বলে দাবি করেছেন হাওরকেন্দ্রিক সংগঠনের নেতারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলার ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাওরের নিচু অংশে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর এবং হাওর নয় বা উঁচু জমিতে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর।

গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত হাওরে কাটা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫ হেক্টর এবং হাওরে নয়, এমন ২৬ হাজার ১২১ হেক্টর। সব মিলিয়ে গড়ে ৭২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে কৃষি বিভাগের এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাওরের কৃষকদের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, ধান কাটা ও ক্ষয়ক্ষতির সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার বড় ধরনের অমিল রয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সবাই এখন ধানের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত
ছবি: প্রথম আলো

সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদ বলেন, গভীর হাওর এলাকায় এখন থই থই পানি, সেখানে ধানের অস্তিত্ব নেই। অথচ কৃষি বিভাগ ধান থাকার কথা বলছে এবং ক্ষতির পরিমাণও কম দেখাচ্ছে। এটি কৃষকদের প্রতি একধরনের উপহাস।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব এখনো প্রস্তুত হয়নি, এটি করতে সময় লাগবে। তিনি বলেন, কয়েক দিন রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে। এ অবস্থা বজায় থাকলে কৃষকেরা অবশিষ্ট ধান ঘরে তুলতে পারবেন।

আরও পড়ুন