জাকিরের উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন, সামর্থ্য নেই পরিবারের

বরিশালের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যুবদল নেতা জাকির হোসেন সিকদার। আজ শুক্রবার দুপুরে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

হাতুড়ি ও জিআই পাইপ দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ও বুকের পাঁজরের হাড় ভেঙে দেওয়ার পর বরিশালের গৌরনদীর যুবদল নেতা জাকির হোসেন সিকদার ওরফে বাচ্চু (৪২) একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

জাকির গৌরনদী পৌর যুবদলের আহ্বায়ক। তাঁর পরিবারের দাবি, হামলা করে যেভাবে জাকিরের হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তাঁর উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সামর্থ্য তাঁদের নেই।

ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জাকির শুক্রবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে ওরা এত মাইর মেরেছে যে, কোনো মানুষ, মানুষকে এভাবে মারে না।’ এ সময় আক্ষেপ করে জাকির বলেন, ‘আমি এ ঘটনায় মামলা করতে চাই না। মামলা করে কী হবে। উল্টো পরিবারের সদস্যরা হামলা-হয়রানির শিকার হবে। দেশের জনগণের কাছে এর বিচারের ভার দিলাম।’

আরও পড়ুন

জাকিরের অভিযোগ, বুধবার বিকেলে বরিশালে বিএনপির বিভাগীয় রোডমার্চের প্রস্তুতি সভায় যোগ দিতে বরিশাল যাওয়ার সময় তাঁর ওপর এই হামলা হয়। ওই দিন বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গৌরনদী পৌর এলাকার গয়নাঘাট কাঁচাবাজারে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা ১৫-১৬ জনের একদল যুবক তাঁর ওপর হামলা চালান। হামলাকারীরা জিআই পাইপ-হাতুড়ি এবং কাঠের শক্ত চেরা দিয়ে বেধড়ক পেটানোর পর তাঁর ডান হাঁটুর নিচে দুই স্থানে, বাঁ হাঁটুর নিচে একটি স্থানে এবং বাঁ হাতের কবজি-কনুই ছাড়াও বাঁ পাঁজরের একটি হাড় পিটিয়ে ভেঙে দিয়েছে। গৌরনদী পৌর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আতিক মিয়ার নেতৃত্বে তাঁর ওপর হামলা করা হয়।

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আতিক মিয়া। তিনি হামলার পর বলেছিলেন, ‘হামলার সঙ্গে আমার বা যুবলীগের কারও সম্পৃক্ততা নেই।’

ওই দিন হামলার পর জাকিরকে অচেতন অবস্থায় স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে যান। এরপর তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে সরাসরি বরিশালে এনে রাত ১০টার দিকে বরিশাল নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন।

হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ বাবুল সাহা বলেন, ‘জাকিরের দুই পায়ের দুটি স্থান ও বাঁ হাতের দুটি স্থান ভেঙে গেছে।’

শুক্রবার দুপুরে ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জাকিরে দুই পায়ের গোড়ালি থেকে ঊরু পর্যন্ত প্লাস্টার করা। বাঁ হাতের পুরোটা প্লাস্টারে আবৃত। নড়াচড়া করতে পারছেন না। ব্যথা আর অস্থিরতায় কিছুক্ষণ পর পর কাতরাচ্ছেন। পাশে থাকা তাঁর স্ত্রী খাদিজা খানম বলেন, রাতে ঘুমাতে পারেন না। একটু তন্দ্রা যেতেই আবার আঁতকে ওঠেন আতঙ্কে। দিনের বেলাও সারাক্ষণ অস্থিরতা আর ব্যথায় কাতরান। নিরাপত্তার কারণে গুরুতর আহত হলেও তাঁর স্বামীকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করতে পারেননি।
নগরের ওই বেসরকারি হাসপতালে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি কেবিনে দুই পা ও বাঁ হাত প্লাস্টার করা অবস্থায় শুয়ে আছেন। পাশে তাঁর স্ত্রী। জাকিরের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। কেন আপনাকে এত মারল—জিজ্ঞেস করতেই জাকির ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালেন। তিনি বলেন, ‘আমার অপরাধ একটাই, আমি বিএনপি করি। ওরা চায় না ওখানে কেউ বিএনপি করুক।’

গত ফেব্রুয়ারিতেও জাকিরের ওপর আরেকবার হামলা হয়েছিল। তখন তাঁর বাঁ পা পিটিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ছয় মাস চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠতে না উঠতেই আবার তাঁর ওপর হামলা করা হলো। সেই হামলার ঘটনায়ও কোনো মামলা করেননি জাকির। জাকির বললেন, ‘আমার উন্নত চিকিৎসা দরকার। ঢাকায় যাব, উন্নত চিকিৎসা করাব; সেই সামর্থ্য আমার নেই। আগেরবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।’

জাকির জানান, গৌরনদীতে গত কয়েক মাসে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ৭০-৮০ জন নেতা–কর্মীর ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা হয়েছে। কয়েকটি ঘটনা পত্রিকায় এসেছে, বেশির ভাগ আসেনি। নীরবে-নিভৃতে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন হামলার শিকার নেতা-কর্মীরা। এসব ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।

হামলার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জাকির হোসেন বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, ঘটনার আতঙ্ক এখনো তাঁকে তাড়া করছে। জাকির কিছুটা ক্ষীণস্বরে বলেন, ‘আমি বরিশালে প্রস্তুতি সভায় যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে নেমে গৌরনদী পৌর এলাকার গয়নাঘাট কাঁচাবাজারে পৌঁছাই। এর মধ্যেই কিছু বুঝে ওঠার আগে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল লাঠিসোঁটা, হাতুড়ি, হকিস্টিক ও জিআই পাইপ নিয়ে আমার ওপর অতর্কিতভাবে হামলে পড়ে। আমি বহু অনুনয়–বিনয় করে, কান্নাকাটি করে জীবন ভিক্ষা চাইলেও ওরা আমাকে ছাড়েনি। সেখানে অনেক লোক থাকলেও আমাকে রক্ষার জন্য কেউ এগিয়ে আসার সাহস পাননি। এরপর আমি অচেতন হয়ে যাই, আর কিছুই মনে করতে পারি না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৌরনদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফজাল হোসেন শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনার কথা শুনিনি এবং আমাকে কেউ জানায়নি। এ ছাড়া এমন ঘটনায় থানায় কেউ অভিযোগও করেনি।’