সাত দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন আবদুস সালাম। জ্বর নিয়ন্ত্রণে না আসায় ৭০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি গত রোববার বিকেলে বরগুনা থেকে বরিশালে আসেন। ভর্তি হন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শয্যা না পেয়ে ঠাঁই নেন হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচতলার বরান্দার মেঝেতে।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে কথা হয় আবদুস সালামের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলো বলেন, ‘এমনিতেই জ্বরে কাহিল। হ্যারপর সিট পাই নাই। খুব কষ্ট অইতে আছে।’
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বরগুনা থেকে আরেক রোগী বেলাল হোসেন হাসপাতালে ভর্তি হন গত শনিবার। তিনিও শয্যা না পেয়ে একই ভবনের বারান্দার মেঝেতে বিছানা পেতেছেন। গত রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি শয্যা পাননি। অবশ্য শয্যা না পাওয়া নিয়ে তাঁর আক্ষেপ নেই। তবে বেলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালের শৌচাগারগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। দুর্গন্ধ ও নোংরার কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী।
আবদুস সালাম ও বেলাল হোসেনের মতো অনেক রোগী শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের ওয়ার্ড ও বারান্দার মেঝেতে এবং হাঁটাচলার পথে ঠাঁই নিয়েছেন। গতকাল সকালে হাসপাতালের পুরোনো ভবনে সার্জারি, অর্থোপেডিক, গাইনি ও শিশু ওয়ার্ড এবং নতুন ভবনের মেডিসিন ইউনিট ঘুরে রোগীদের ভিড় দেখা যায়।
দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১ কোটি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা ছাড়াও অবস্থানগত সুবিধার কারণে মাদারীপুর, বাগেরহাট এবং শরীয়তপুর ও লক্ষ্মীপুরের একটি অংশের লোকজন এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। ৫৮ বছরে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ২৫০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার। বেড়েছে রোগীর চাপও। তবে সেই অনুপাতে বাড়েনি জনবল ও চিকিৎসাসেবার পরিধি। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ঘাটতি নিয়ে রোগীদের চাপ সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে ৫০০ শয্যার পুরোনো জনবলকাঠামো দিয়ে। এখানে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার রোগী সেবা নিতে আসেন। বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ছয় হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। সে হিসাবে রোগী ভর্তি থাকেন শয্যার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি। এই বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
১৯৬৮ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে হাসপাতালটি চালু হয়। ১৯৭০ সালে ৩২৪ শয্যায় এবং ১৯৭৪ সালে ৫০০ শয্যায় উন্নীত হয়। এরপর ২০১৩ সালে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত হয়। হাসপাতাল চত্বরে পাঁচতলা একটি পুরোনো ভবন এবং নতুন অপর একটি পাঁচতলা ভবনে বর্তমানে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম।
হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক দুর্গা প্রসাদ সরকার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসকেরা থাকেন। বেলা তিনটা থেকে পরদিন সকাল নয়টা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবার জন্য ইন্টার্ন চিকিৎসকই ভরসা। এখানে প্রতিদিন এত রোগীর ভিড় থাকে, যা সামলাতে আরও বেশি চিকিৎসক দরকার।
চিকিৎসকের ৯৪টি পদ শূন্য
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, পুরোনো ৫০০ শয্যার জনবলকাঠামো অনুযায়ী, চিকিৎসকের ৩২৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২২৯ জন। পদ শূন্য রয়েছে ৯৪টি। সে হিসাবে চিকিৎসকের শূন্য পদের হার ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ। এ ছাড়া হাসপাতালের তৃতীয় শ্রেণির ১৮৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে শূন্য ৬৬টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ৪১৪টি পদের মধ্যে শূন্য ২১৬টি। সিনিয়র নার্স, প্রশাসিক কর্মকর্তাসহ দ্বিতীয় শ্রেণির ৫৯৭টি পদের মধ্যে ২৮২টি শূন্য। অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণির ৪৭ শতাংশ পদ খালি।
জনবলসংকট সামাল দিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২২২ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর পরও রোগীর চাপের তুলনায় কর্মীর সংখ্যা কম। বহির্বিভাগের চিত্র আরও নাজুক। প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার রোগীর বিপরীতে চিকিৎসক আছেন ৫৩ জন। অর্থাৎ একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন গড়ে ৭৫ জন রোগী দেখতে হচ্ছে। এর মধ্যে কোনো চিকিৎসকের ছুটি থাকলে সেদিন চাপ আরও বেড়ে যায়।
পুরোনো অবকাঠামো ও জনবলসংকটের মধ্যেও তাঁরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জনবলসহ অন্যান্য সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ মেহেদি হাসান প্রথম আলোকে বলেন, নানা সংকটের মধ্যেও হাসপাতালে আসা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত দিতে তাঁরা চেষ্টা করছেন।
হাসপাতালের একটি সূত্র বলছে, হাসপাতালে সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন (সিসিএম) ইউনিট নেই। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) সুবিধা থাকলেও গুরুতর রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ সেবার ঘাটতি রয়েছে। হৃদ্রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্যাথল্যাব (বিশেষায়িত কক্ষ) নেই। ফলে এনজিওগ্রামের মতো বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীদের ঢাকামুখী হতে হয়।
রোগী পরিবহনে ট্রলিরও সংকট
জনবলসংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীর স্বজনেরা। জরুরি বিভাগে রোগী পরিবহনের জন্য তিনটি পালায় ট্রলিম্যানের ২১টি পদ রয়েছে। কর্মরত আছেন ১৯ জন। তাঁদের মধ্যে দুজনকে অন্তর্বিভাগে দায়িত্ব পালন করতে হয়। জরুরি বিভাগে রোগী, এমনকি লাশ পরিবহনের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে ট্রলিম্যান না পেয়ে স্বজনদের ট্রলি ঠেলতে হয়। একই অবস্থা হুইলচেয়ার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও।
বিপুলসংখ্যক রোগীর মধ্যে গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের ওয়ার্ডে নেওয়া, এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে স্থানান্তর এবং হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্যাথলজি বিভাগে নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রলির প্রয়োজন হয়। হাসপাতালে ট্রলি আছে মাত্র ১৩টি। এর মধ্যে নিয়মিত চলাচলের উপযোগী থাকে ৯ থেকে ১০টি। বর্তমানে রোগীর চাপ অনুযায়ী ট্রলি দরকার ৫০টি।
৫ অক্টোবর দুপুরে এক বৃদ্ধকে হাসপাতালে নিয়ে এসে তাঁর নাতি রামিন হোসেন পড়েন বিপাকে। সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রামিন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা নানা স্ট্রোক করার পর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তাঁকে বহনের জন্য ট্রলি পাননি। পরে একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকসহ তিনজন মিলে তাঁকে কোলে তুলে নিচতলা জরুরি বিভাগ থেকে তিনতলায় ওয়ার্ডে নিয়ে যান।
নতুন ভবনে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট
হাসপাতালের নতুন পাঁচতলা ভবনে দিনে-রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এতে লিফট, ফ্যান ও লাইট বন্ধ হয়ে যায়। ভবনটিতে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী ভর্তি থাকেন। বিদ্যুৎ–সংকটে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা ২০-২৫টি থেকে কমে ১০-১২টিতে নেমে আসে। জেনারেটর থাকলেও জ্বালানিসংকটে তা নিয়মিত চালানো যায় না। প্রতি ঘণ্টায় জেনারেটরে প্রায় ১১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরোনো ভবনে দুটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন চালু রয়েছে। নতুন ভবনে আরও একটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন চালু এবং জেনারেটরের জন্য জ্বালানি বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর প্রথম আলোকে বলেন, পুরোনো অবকাঠামো ও জনবলসংকটের মধ্যেও তাঁরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জনবলসহ অন্যান্য সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।