ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা জেলার ১১টি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে বার্ষিক আয় সবচেয়ে বেশি জাকারিয়া তাহেরের (সুমন)। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার সভাপতি জাকারিয়া তাহের কুমিল্লা-৮ সংসদীয় আসন থেকে ভোটে লড়ছেন। তাঁর বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ৫৯ কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি।
বার্ষিক আয় জাকারিয়া তাহেরের সবচেয়ে বেশি হলেও জেলার বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাতে নগদ অর্থ আছে রেদোয়ান আহমেদের। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদান করা রেদোয়ান আহমেদ কুমিল্লা-৭ আসন থেকে ভোটে লড়ছেন। তাঁর হাতে নগদ টাকা আছে ৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার বেশি।
গত ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় কুমিল্লার ১১টি আসনের বিএনপির সব প্রার্থী তাঁদের আয় ও সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেছেন। এই প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে পেশা হিসেবে ১০ জনই ‘ব্যবসা’র কথা উল্লেখ করেছেন। কুমিল্লা-২ আসনের প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা বিভাগ) মো. সেলিম ভূঁইয়া তাঁর পেশা ‘আইনজীবী’ বলে উল্লেখ করেছেন।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ১০ ধরনের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করতে হয়। এর মধ্যে আছে প্রার্থীর পেশা, আয়ের উৎস, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মামলা-সংক্রান্ত তথ্য, প্রার্থীর নিজের ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদবিবরণী। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।
কুমিল্লার ১১টি আসনে বিএনপির প্রার্থী যাঁরা
কুমিল্লা-১ আসনে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, কুমিল্লা-২ আসনে মো. সেলিম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৩ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, কুমিল্লা-৫ আসনে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জসীম উদ্দিন, কুমিল্লা-৬ আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী, কুমিল্লা-৭ আসনে রেদোয়ান আহমেদ, কুমিল্লা-৮ আসনে জাকারিয়া তাহের (সুমন), কুমিল্লা-৯ আসনে বিএনপির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল কালাম, কুমিল্লা-১০ আসনে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা আবদুল গফুর ভূঁইয়া এবং কুমিল্লা-১১ আসনে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. কামরুল হুদা দলীয় প্রার্থী। এরই মধ্যে যাচাই-বাছাইয়ে বিএনপির সব প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতায় এগিয়ে আছেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি পিএইচডি ডিগ্রিধারী। মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) পাস করেছেন চারজন। কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ ও মো. জসীম উদ্দিন এসএসসি বা মাধ্যমিক পাস করেছেন। স্নাতক পাস করা প্রার্থী আছেন দুজন। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রেদোয়ান আহমেদ এলএলএম পাস করেছেন।
বার্ষিক আয়ে এগিয়ে যাঁরা
কুমিল্লা-৮ আসনের প্রার্থী জাকারিয়া তাহেরের বার্ষিক আয় ৫৯ কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে ব্যবসা থেকে আসে ১ কোটি ১২ লাখ টাকা। তাঁর সবচেয়ে বেশি মূলধনি আয় ৫০ কোটি ২১ লাখ টাকা। এরপরই বেশি আয় করেন কুমিল্লা-৫ আসনের মো. জসীম উদ্দিন। তাঁর বার্ষিক আয় ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকার বেশি। কুমিল্লা-৭ আসনের রেদোয়ান আহমেদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকার বেশি। বছরে ৫০ লাখ টাকার বেশি আয় করেন ৫ জন প্রার্থী। সবচেয়ে কম আয় কুমিল্লা-২ আসনের মো. সেলিম ভূঁইয়ার। তাঁর বার্ষিক আয় ১৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা।
হাতে নগদ টাকা বেশি যাঁর
১১ আসনের প্রার্থীদের মধ্যে রেদোয়ান আহমেদের হাতে নগদ অর্থ আছে ৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার বেশি। এরপরই কুমিল্লা-১১ আসনের মো. কামরুল হুদার নগদ অর্থ আছে ২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। কুমিল্লা-৯ আসনের মো. আবুল কালামের নগদ অর্থ আছে ২ কোটি ৪১ লাখ টাকার বেশি। সবচেয়ে কম নগদ টাকা আছে সেলিম ভূঁইয়ার। তাঁর নগদ অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। কোটি টাকার বেশি হাতে নগদ অর্থ আছে—এমন প্রার্থীর সংখ্যা ৩।
প্রার্থীদের মধ্যে জাকারিয়া তাহের অস্থাবর সম্পদের দিকে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন। তাঁর সর্বমোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১৯১ কোটি ৪১ লাখ টাকার বেশি। এরপরই মো. আবুল কালামের মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকার বেশি।
পেশা থেকে আয় নেই ৪ প্রার্থীর
কুমিল্লা-১ আসনের প্রার্থী খন্দকার মোশাররফ হোসেন তাঁর পেশা ‘ব্যবসা’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু হলফনামায় ‘ব্যবসা’ থেকে তাঁর কোনো আয়ের কথা উল্লেখ করা হয়নি। কুমিল্লা-২ আসনের সেলিম ভূঁইয়ার পেশা আইনজীবী হলেও ‘আইন’ পেশা থেকে তাঁর বার্ষিক আয়ের তথ্য উল্লেখ নেই হলফনামায়। কুমিল্লা-৩ আসনের কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের পেশা ‘ব্যবসা’ বলা হলেও এই খাতে তাঁর আয় ‘শূন্য’ বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনি। কুমিল্লা-৪ আসনের মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর পেশা ‘ব্যবসা’ বলা হলেও হলফনামায় এই খাতে আয়ের পরিমাণ ‘ফাঁকা’ রেখেছেন তিনি।
অস্থাবর সম্পদে এগিয়ে
প্রার্থীদের মধ্যে জাকারিয়া তাহের অস্থাবর সম্পদের দিকে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন। তাঁর সর্বমোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ (হাতে নগদ, ব্যাংক জমাসহ) ১৯১ কোটি ৪১ লাখ টাকার বেশি। এরপরই মো. আবুল কালামের মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকার বেশি। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি ৪ লাখ টাকার বেশি। পাঁচ কোটি টাকার বেশি একজনের, চার কোটি টাকার বেশি একজনের এবং দুই কোটি টাকার বেশি অস্থাবর সম্পদ রয়েছে আরেকজন প্রার্থীর। সবচেয়ে কম অস্থাবর সম্পদ রয়েছে সেলিম ভূঁইয়া ও মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর। তাঁদের দুজনের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা করে।
স্থাবর সম্পদে এগিয়ে যাঁরা
স্থাবর সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন কুমিল্লা-৯ আসনের মো. আবুল কালাম। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৬৫ কোটি টাকা। এরপরই আছেন কুমিল্লা-৭ আসনের রেদোয়ান আহমেদ। তাঁর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪৫ কোটি টাকা। কুমিল্লা-৮ আসনের জাকারিয়া তাহেরের ৪০ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ আছে। কুমিল্লা-৪ আসনের মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী তাঁর হলফনামায় স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ১ দশমিক ৪৫ একর কৃষিজমি আছে বলে উল্লেখ করেছেন। তবে সেটির মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। কুমিল্লা-৩ আসনের কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ অর্জনকালীন মূল্য ২০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়কর রিটার্নে এগিয়ে যাঁরা
আয়কর রিটার্নে ২০৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন জাকারিয়া তাহের। চলতি অর্থবছরে ১০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আয়কর দিয়েছেন তিনি। আয়কর রিটার্নে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্পদ দেখিয়েছেন মো. আবুল কালাম। তিনি ৪৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। খন্দকার মোশাররফ হোসেন চলতি অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে ১৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। আয়কর রিটার্নে সবচেয়ে কম সম্পদ দেখানো হয়েছে আবদুল গফুর ভূঁইয়ার। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ২৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
প্রার্থীদের স্ত্রীরাও বিপুল সম্পদের অধিকারী
কুমিল্লা-৮ আসনের জাকারিয়া তাহেরের স্ত্রীর বার্ষিক আয় ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সর্বমোট ৪০ কোটি ৭৮ লাখ টাকার অস্থাবর এবং ২০ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে তাঁর। আয়কর রিটার্নে জাকারিয়া তাহেরের স্ত্রীর নামে দেখানো হয়েছে ১২৮ কোটি ২১ লাখ টাকার সম্পদ। তিনি চলতি অর্থবছরে আয়কর দিয়েছেন ২ কোটি ১১ লাখ টাকা। খন্দকার মোশাররফ হোসেনের স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ৬৩ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৬ কোটি ৪১ লাখ ৮১ হাজার টাকা। রেদোয়ান আহমেদের স্ত্রীর হাতে নগদ অর্থ আছে ৪৫ লাখ টাকা। তাঁর মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, স্থাবর সম্পদ আছে ২৫ কোটি টাকার।
আবদুল গফুর ভূঁইয়ার স্ত্রীর বার্ষিক আয় ৩১ লাখ ১০ হাজার টাকা। স্ত্রী হাতে নগদ টাকা আছে ১২ লাখ ৩৭ হাজার টাকাসহ মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৫৫ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পদে গফুর ভূঁইয়ার স্ত্রীর নামে ৬ কোটি ৭৫ লাখ মূল্যের একটি বাড়ি ও তিনটি ফ্ল্যাট আছে। কামরুল হুদার স্ত্রীর হাতে নগদ অর্থ আছে ৬১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৩ লাখ এবং স্থাবর সম্পদের মধ্যে আছে ৬০ লাখ টাকার অকৃষিজমি। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর স্ত্রীর ২১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৩ টাকা হাতে নগদসহ ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার রয়েছে স্থাবর সম্পদ। মো. জসীম উদ্দিনের স্ত্রীর বার্ষিক আয় ২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। হাতে আছে ৪৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা। আর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৫১ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ হলফনামায় আয়কর রিটার্নে স্ত্রীর নামে দেখানো সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ১০ লাখ ২৩ হাজার টাকা উল্লেখ করেছেন। তবে হলফনামায় স্ত্রীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের কোনো বিবরণ দেননি তিনি। একইভাবে মনিরুল হক চৌধুরী হলফনামায় স্ত্রীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের কোনো বর্ণনা দেননি। তবে আয়কর রিটার্নে তাঁর স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ৯৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিওতে বলা হয়েছে, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে অথবা তথ্য গোপন করলে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। নির্বাচিত হওয়ার পরও তদন্তের মাধ্যমে তথ্যে গরমিল প্রমাণিত হলে ‘প্রার্থীর প্রার্থিতা আইনসিদ্ধ ছিল না’ ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট আসনে নির্বাচন বাতিল করতে পারে নির্বাচন কমিশন।