কিশোর গ্যাং নেতা রতনের সঙ্গে এবার ছাত্রদল নেতার ফোনালাপ প্রকাশ্যে, যে কথা হলো
কুমিল্লায় স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের মিছিলে আলোচিত কিশোর গ্যাং নেতা ইমরান হোসেন ওরফে রতনের (২৫) উপস্থিতি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এবার কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ২ মিনিট ৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দুজনের মধ্যে মিছিলে রতনের উপস্থিতি এবং তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়।
আজ বৃহস্পতিবার ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রতনের চেহারা দেখা যায় না। তিনি লাউডস্পিকারে কথা বলার সময় পাশের অন্য একজনকে দিয়ে কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করেছেন। ভিডিওতে তাঁর পাশে আরেক তরুণীকেও কথা বলতে শোনা যায়।
ছাত্রদল নেতা মহসিনের দাবি, এই কথোপকথন গত শনিবার হয়েছে। ছাত্রদল নেতার মিছিলে কিশোর গ্যাং লিডার—গণমাধ্যমে এমন সংবাদ আসার পর তাঁকে একটি নম্বর থেকে ইমরান নামে কল করা হয়েছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে কুমিল্লা মহানগর ও দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণে বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলের অগ্রভাগে মহসিনকে এবং তাঁর ঠিক পেছনে রতনকে দেখা যায়—এমন একটি ভিডিও ২৫ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ইমরান হোসেন রতন কুমিল্লা নগরের অন্যতম শীর্ষ কিশোর গ্যাং ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’–এর প্রধান।
সমালোচনার মুখে ২৮ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে মহসিন দাবি করেছিলেন, রতনের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। বড় পরিসরের ওই মিছিলে হাজারো মানুষের ভিড়ে রতন কীভাবে তাঁর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, তা তিনি জানতেন না। এমনকি রতনকে আগে কখনো দেখেননি বা চেনেন না বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।
তবে ছড়িয়ে পড়া ফোনালাপে মিছিলে রতনের উপস্থিতি এবং তাঁকে নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের প্রসঙ্গে দুজনকে কথা বলতে শোনা যায়। কথোপকথনের কিছু অংশ নিচে তুলে দেওয়া হলো:
রতন: কিতা কইছো তুমি এইডা তুমি আবার হুনো (শোনো) না ভাই।
মহসিন: আমি কইছি তো; তুই আমারে কইলেই না আমি উত্তর দিতাম।
রতন: এহন এত কথা তো আর মনে থাহে না। এখন কইতাছি ভাই, আমরা কি আমরার লাইগ্যানি গেছিলাম প্রোগ্রামডাত?
মহসিন: আমি কি তোরে কইছি যে তোর লাইগ্যা আইছত, আমাগো লাইগ্যা আইছত না?
রতন: হ্যাঁ।
মহসিন: আমারে সাংবাদিকেরা ফোন দিছে। তোর ভিডিও দেইখ্যা কইতাছে—কিশোর গ্যাং, অস্ত্রধারী, হত্যা মামলার আসামি, কিশোর গ্যাংয়ের লিডার রতনের সাথে মহসিনকে পাওয়া গেছে।
রতন: হ্যাঁ।
মহসিন: ঠিক আছে? আমারে সাংবাদিক ফোন দিছে। তারপরে বলতাছে, আপনি কি রতনকে চেনেন? আপনার মিছিলে আছিল। আমি কইছি, আমার মিছিলে এক হাজার লোক ছিল। আমারে দায়িত্ব দিছে মিছিলের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। আমার এইটা দায়িত্ব। কে এই জায়গায় কিশোর গ্যাংয়ের লিডার, কে সন্ত্রাসী—এইটা তো আমি জানি না। কেউ কিশোর গ্যাংয়ের লিডার, সন্ত্রাসীর সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নাই।
রতন: হুম।
মহসিন: তুমি কি সন্ত্রাসনি? তুমি কি এইখানো কোনো মার্ডার করছ কালকে? মিছিলে কি তুমি কোনো মার্ডার করছ?
রতন: না।
মহসিন: তুমি কি কাউকে মার্ডার করছ? তোমার হাতে কি দাও আছিল? আমি এই কথাডা বলছি।
রতন: হ্যাঁ।
মহসিন: আমি তোমারে নিউজটা দিতাছি?
রতন: নিউজডা তো ভাই, বহুজনে দিতাছে ভাই আমারে। বুজ্জনি ভাই।...এহন এইডা কিতা করোন?
মহসিন: আমার কথাডা শোনো। তোমারে যে কইতাছে, অস্ত্রধারী, হত্যা মামলার আসামি। এই কথাটা কি আমি কইছি, না সাংবাদিক কইছে?
রতন: যেডিই হোক ভাই, তুমি তো কইতা যে এটাডা রুবেল ভাইয়ের প্রোগ্রামে গেছে বা আমরার প্রোগ্রামে আইছে। এইডা তো কওন আছিল তুমি (তোমার)। এহানে তো অস্ত্র দিয়া কোনো মহড়া হইছে না। এইডা কওন আছিল না তোমার? এহানো কোনো অস্ত্রের মহড়া হইছে না। প্রোগ্রামে আইছে তারা।
মহসিন: আমার কথাটা তুমি শোনো। তুমি নিউজটা দেখো। তুমি নিউজটা দেখলে শুনবা যে আমি কী বলছি। তুমি শুনবা।
রতন: ভাই, আমি হুনছি ভাই, হোনো ভাই। এখন কইতাছি, তোমার এইডা কওন আছিল যে হে আমরার কাছে আইছে, রুবেল ভাইয়ের প্রোগ্রাম আইছে। তুমি কও নাই তো ভাই।...
ফোনালাপে আসা কে এই রুবেল ভাই
ছড়িয়ে পড়া ফোনালাপে রতনের কথায় ‘রুবেল’ নামটি একাধিকবার এসেছে। তিনি মহসিনকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, তিনি ‘রুবেল ভাইয়ের প্রোগ্রামে’ এসেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রুবেল বলতে কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক সেলিম ওরফে রুবেলকে বোঝানো হয়েছে। মহসিনের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। তাঁরা একই এলাকার বাসিন্দা এবং আগে একই রাজনৈতিক সংগঠনের (ছাত্রদল) রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা মহসিনকে বর্তমান স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রুবেলের একসময়ের কর্মী হিসেবে জানেন।
বৃহস্পতিবার রাতে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আতিক সেলিম ওরফে রুবেল প্রথম আলোকে বলেন, তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি বড় কর্মসূচিতে মহসিনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ওই কর্মসূচিতে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। মহসিন তাঁর সঙ্গে একই ওয়ার্ডের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে মিছিলে এসেছিলেন।
রুবেলের ভাষ্য, তিনি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ওই কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। মহসিনকে তিনি মিছিলের শৃঙ্খলা বজায় রেখে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে মহসিন মিছিলে কাদের নিয়ে এসেছেন বা তাঁর সঙ্গে কারা ছিলেন, সে বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা দায় নেই।
কিশোর বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে রাজনীতি করান না বলেও দাবি করেন রুবেল। তাঁর দাবি, মিছিলে রতন কীভাবে বা কার সঙ্গে এসেছেন, সে বিষয়ে তিনি জানতেন না। তাঁর ভাষ্য, তিনি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন; কারা তাঁদের সঙ্গে মিছিলে এসেছেন, সেটি তাঁদের নিজেদের দায়িত্ব।
ফোনালাপের বিষয়ে জানতে চাইলে মহসিন বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ইমরান নামে একজন তাঁকে শনিবার কল করে কথা বলেছেন। তবে ওই কথোপকথনে তিনি এমন কোনো কথা বলেননি, যাতে বোঝা যায় তিনি রতনকে প্রোগ্রামে আসতে বলেছেন। তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিষয়টি খতিয়ে দেখছে ছাত্রদল
ফোনালাপের বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নাহিদুজ্জামান রানা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সব সময় কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী আন্দোলন করছেন। প্রথম ভিডিওর পর কিশোর গ্যাং লিডারের সঙ্গে মহসিনের কথোপকথনের দ্বিতীয় ভিডিওটি তাঁদের নজরে এসেছে। বিষয়টি তাঁরা খতিয়ে দেখছেন। এরপর বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের জানানো হবে। কেন্দ্রীয় নেতারা প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবেন।
পুলিশও বিষয়টি তদন্ত করে দেখার কথা জানিয়েছে। জানতে চাইলে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ভিডিওটির বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। এরপর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।