হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ
১০ বছরেও হয়নি স্থায়ী ক্যাম্পাস, জায়গা নির্ধারণেই আট বছর পার
কলেজ ক্যাম্পাস স্থাপনের জায়গা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সদর হাসপাতালে প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট জায়গায় চলছে কলেজের কার্যক্রম।
প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ। মাত্র পাঁচটি শ্রেণিকক্ষ, পাঁচটি অফিস কক্ষ ও একটি গবেষণাগার নিয়েই চলছে কলেজের কার্যক্রম। অবকাঠামোর এই সীমাবদ্ধতার প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় বাস্তব রোগীর চিকিৎসায় অংশ নিয়ে হাতে-কলমে শেখার (ইন্টার্ন) সুযোগও পর্যাপ্ত নয়।
২০১৬ সালে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ সাল থেকে। হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালের ভবনের কয়েকটি তলায় অস্থায়ীভাবে চলছে কলেজটির শিক্ষা ও দাপ্তরিক কার্যক্রম। বছর বছর শিক্ষার্থী বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি সুযোগ-সুবিধা।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় একদিকে যেমন শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে, অন্যদিকে ব্যবহারিক শিক্ষা, লাইব্রেরি, আবাসনসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। মেডিকেল শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস ও নিজস্ব হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।
৩ হাজার বর্গফুটের কলেজ
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলা সদর হাসপাতালের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও অষ্টম তলায় কলেজটির কার্যক্রম চলছে। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে দাপ্তরিক কার্যক্রম। সেখানে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের জন্য দুটি পৃথক কক্ষ রয়েছে। অন্য শিক্ষকদের জন্য রয়েছে একটি কক্ষ। দ্বিতীয় তলার আংশিক এবং তৃতীয় তলার জায়গায় পাঁচটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ বলে কলেজ সূত্রে জানা গেছে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, কলেজে বর্তমানে মোট ৩৮৯ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছাত্রী ২৪৬ জন, ছাত্র ১৪৩ জন। ইন্টার্ন করছেন ৪৯ জন। শুরুতে প্রতি ব্যাচে ৫১ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ষষ্ঠ ও সপ্তম ব্যাচে ১০০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তবে বর্তমানে অষ্টম ও নবম ব্যাচে ৫১ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। এখন পর্যন্ত তিনটি ব্যাচে ১৫০ জন এমবিবিএস পাস করেছেন। চতুর্থ ব্যাচটি চূড়ান্ত পর্বে আছে।
সম্প্রতি নতুন করে ৩০ একর জমির প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি পত্র (ডিও) দিয়েছেন হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষার্থী অনুপাতে শ্রেণিকক্ষের সংকট আছে। যার কারণে গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হয়। এতে স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠ গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে। পাঁচটি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে তিনটিতে ১০০ জন করে বসা যায়। অপর দুটির মধ্যে একটিতে ৫০ জন ও অপরটিতে ৭০ জন করে বসার ব্যবস্থা আছে। পর্যাপ্ত আসন না থাকায় পালাক্রমে ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে।
নুর উদ্দিন নামের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘এ কলেজের প্রতি শিক্ষাবর্ষে আসন হচ্ছে ৫১টি। অথচ গত দুই শিক্ষাবর্ষে ১০০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। যে কারণে মাত্র পাঁচটি শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করেই আমাদের ক্লাস করতে হয়।’
মেডিকেল কলেজটিতে ৪৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক ৭ জন, সহযোগী অধ্যাপক ১১, সহকারী অধ্যাপক ১৩, প্রভাষক ১৬ জন ও কিউরেটর ২ জন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, বিভাগভিত্তিক শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে ব্যবহারিক ও ক্লিনিক্যাল শিক্ষার মান ধরে রাখতে শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য নয়, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্যও পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন।
নেই নিজস্ব হাসপাতাল ও হোস্টেল
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের নিজস্ব কোনো হাসপাতাল নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ও ক্লিনিক্যাল শিক্ষার (রোগীর চিকিৎসার মাধ্যমে শিক্ষা) জন্য সদর হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকায় শিক্ষার্থীদের আবাসনের কোনো ব্যবস্থা করতে পারেনি কলেজ প্রশাসন। যে কারণে নিজেদের উদ্যোগে শহরের নানা স্থানে মেস, হোস্টেল কিংবা বাসা ভাড়া করে থাকেন তাঁরা। এতে তাঁদের বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, আবাসিক ব্যবস্থা ও নিজস্ব হাসপাতাল থাকা জরুরি। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পরও এসব মৌলিক অবকাঠামোর অনেকগুলোই না থাকায় তাঁদের শিক্ষা কার্যক্রম নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলছে।
এমরান হোসেন নামের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছি ভালোভাবে চিকিৎসাশিক্ষা নেওয়ার জন্য। কিন্তু নিজস্ব ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সুযোগ-সুবিধার সংকট তৈরি হচ্ছে। ’
আট বছরেও জায়গা নির্ধারণ হয়নি
কলেজসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থায়ী ক্যাম্পাস না হওয়ার পেছনে মূল কারণগুলোর একটি হলো জায়গা নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা।
মেডিকেল কলেজটিতে ৪৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক ৭ জন, সহযোগী অধ্যাপক ১১, সহকারী অধ্যাপক ১৩, প্রভাষক ১৬ জন ও কিউরেটর ২ জন।
২০১৮ সালে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জায়গা নির্ধারণের জন্য স্থান প্রস্তাব করা হয় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রিচি গ্রামে। যেখানে হবিগঞ্জ-৩ আসনের আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) তৎকালীন সংসদ সদস্য আবু জাহিরের বাড়ি। তাঁর পছন্দেই স্থানটি নির্ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানটি প্রস্তাবের পর সেই সময় সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত কমিটি স্থানটি সরেজমিন পরিদর্শন করে। স্থানটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য উপযুক্ত নয় বলে মত দেন কমিটির সদস্যরা। কারণ হিসেবে বলা হয়, যে স্থানটি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নিচু ভূমি। এ ভূমিতে সব সময় পানি ও জলাবদ্ধতা লেগে থাকে। জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব ছয় থেকে সাত কিলোমিটার। আশপাশের পরিবেশও মেডিকেল কলেজের জন্য উপযোগী নয়।
পরবর্তী সময়ে আবু জাহিরের তদবিরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও দুইবার পরিদর্শন কমিটি পাঠায়। এ কমিটিগুলোও আগের প্রতিবেদনের ওপর অটল থাকে। এ নিয়ে সময়ক্ষেপণ হয়।
সম্প্রতি নতুন করে ৩০ একর জমির প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি পত্র (ডিও) দিয়েছেন হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ।
গত ৯ জুন দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ২৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় হবিগঞ্জ জেলার অন্যান্য সংসদ সদস্য, হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, জেলা প্রশাসক ও জেলার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে পূর্বনির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করে সদর উপজেলার নুরপুর উত্তর ও চতুল মৌজায় মোট ৩০ একর জমিতে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। প্রস্তাবিত জমির মধ্যে ২ দশমিক ৩৬ একর সরকারি খাসজমি এবং ২৭ দশমিক ৬৪ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে।
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাবেদ জিল্লুল বারী বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার কাজের আওতায় হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজসহ দেশের আরও চারটি কলেজকে নেওয়া হয়েছে। নতুন যে স্থানটি নির্ধারণ করা হয়েছে, স্থানটি স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য খুবই উপযোগী। তিনি মনে করেন, খুব শিগগির ভূমির সমস্যা থেকে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ মুক্তি পাবে।
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ থেকে এখন পর্যন্ত তিনটি ব্যাচে ১৫০ জন এমবিবিএস পাস করেছেন। চতুর্থ ব্যাচটি চূড়ান্ত পর্বে আছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কার্যক্রম চলা কলেজটিতে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখতে পারছেন, এমন প্রশ্ন ছিল কলেজের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অজয় রায় চৌধুরীর কাছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষকদের পেশাগত কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ক্ষেত্রে যে ঘাটতি ছিল বা আছে, তা সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষার্থীদের সেই পরিবেশ দেওয়ার। তা না হলে তো ঘাটতি থেকেই যায়।’