ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে শুরু হয়েছে অষ্টপ্রহরব্যাপী সাধুসঙ্গ

এবারের সাধুসঙ্গ একেবারেই ভিন্নভাবে হচ্ছে। নেই কোনো ঠেলাঠেলি, জটলা। প্রকৃত ফকির, সাধু বাউলদের পদচারণ। হাতে গোনা দর্শনার্থী। আজ সোমবার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতেছবি: প্রথম আলো

পরিচ্ছন্ন আখড়াবাড়িতে ভিড় নেই। যে কয়জন সাধু ফকির আছেন, তাঁরা খণ্ড খণ্ডভাবে বসে আছেন। শান্ত পরিবেশে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে ‘মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষেরও সনে’।

আজ সোমবার বিকেল থেকে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে শুরু হয়েছে অষ্টপ্রহরব্যাপী সাধুসঙ্গ, যা লালন একাডেমির স্মরণোৎসব নামে পরিচিত। এবারের সাধুসঙ্গ একেবারেই ভিন্নভাবে হচ্ছে। নেই কোনো ভিড়। ঠেলাঠেলি নেই। নেই কোনো জটলা। প্রকৃত ফকির, সাধু বাউলদের পদচরণা। হাতে গোনা দর্শনার্থী। কাল মঙ্গলবার বিকেলে শেষ হবে সাধুসঙ্গ।

সাধু ফকিরেরা জানালেন, এই অষ্টপ্রহরে তাঁরা গুরুকার্য করবেন। রাখালসেবা, অধিবাস বাল্যসেবা ও মঙ্গলবার দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্যে তাঁদের সাধুসঙ্গ শেষ হবে। এর মধ্যে তাঁরা গানে গানে লালন শাহকে স্মরণ করবেন। রাতে তাঁরা একতারা বাজিয়ে গান করেন।

প্রতিবছর দোলপূর্ণিমা তিথিতে তিন দিনের আয়োজন থাকলেও এবার রমজানের কারণে ব্যাপ্তি কমানো হয়েছে। নেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা।

সোমবার দুপুরে আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের লালন একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন লেখক-চিন্তক ফরহাদ মজহার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘কুষ্টিয়াকে একটা সংস্কৃতি-আধ্যাত্মিক নগরী ও ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে তৈরি করতে চাই। যাতে সারা দুনিয়ার মানুষ এখানে তীর্থ হিসেবে, সংস্কৃতির একটা মহৎ কেন্দ্র হিসেবে গান বলি, ছবি আঁকা বলি বা যেকোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করি, যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর গাঁয়েবের নিকটবর্তী হতে পারি। গাঁয়েব তো ধরা যায় না। গাঁয়েব কেন ধরা দেবে আমি তো মানুষ, মরণশীল।’

সভায় মুখ্য আলোচক ছিলেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. রাশিদজ্জামান ও বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লালন একাডেমি এ স্মরণোৎসবের আয়োজন করেছে।

দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, উৎসবে অংশ নিতে শনিবার থেকেই কেউ কেউ এসেছেন আখড়াবাড়িতে। আবার কেউ এসেছেন রোববার। ভাগ হয়ে আসনে বসছেন তাঁরা। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে লালন ফকিরের গান। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় উপস্থিতি অনেক কম। নেই চিরচেনা ভিড় জৌলুশ। চট্টগ্রাম থেকে আসা দর্শনার্থী রুপম নাথ বলেন, ‘আমি একজন শিক্ষক। লালন শাহের জাতপাত নেই। তিনি ধর্ম, বর্ণ, জাতিনির্বিশেষে সবাইকে মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। আমরা সবাই একই লক্ষ্যের মানুষ। এই শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি লালনে।’

ফকির হৃদয় শাহ বলেন, লালন সাঁইজি দোলপূর্ণিমার তিথিতে সঙ্গীদের নিয়ে দোল উৎসব করতেন। সেই থেকে সাধু পরম্পর এই উৎসব চলে আসছে। সারা দেশের ভক্তরা ছুটে এসেছে। অষ্টপ্রহর গুরুকার্য ও সাধুসঙ্গ শেষে ফিরে যাবেন আপনধামে।
জেলা প্রশাসক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, মাহে রমজানের কারণে উৎসব সংক্ষিপ্ত করে এক দিন হয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে চলছে লালন স্মরণোৎসব।

বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ তাঁর জীবদ্দশায় ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে প্রতিবছর চৈত্রের দৌলপূর্ণিমা রাতে ফকিরদের নিয়ে সাধুসঙ্গ করতেন। তাঁর মৃত্যুর পরও সেটা চালিয়ে আসছে তাঁর ভক্ত-অনুসারীরা। এ জন্য আখড়াবাড়িতে ভিড় করেছেন ফকির সাধুরা। তবে মাহে রমজানের কারণে এবারের সীমিত পরিসরে আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে এক দিনেই শেষ করা হচ্ছে স্মরণোৎসব।

আরও পড়ুন