জাকির হোসেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ২৭তম বিডিএস কোর্সের শিক্ষার্থী। তিনি ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। ওই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে পাস করে কলেজ থেকে বেরিয়ে গেছেন। পরীক্ষা না দেওয়ার কারণে তিনি পিছিয়ে পড়েছেন।

এবার তিনি ‘থার্ড প্রফ’ (চূড়ান্ত বর্ষের আগের বর্ষ) দিচ্ছেন। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শহীদ কাজী নূরুন্নবী ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র। তাঁর নামে ছাত্রাবাসের ৩২৭ নম্বর কক্ষ বরাদ্দ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এখন ২২৮ নম্বর কক্ষে থাকেন। ওই কক্ষে এসি লাগানো রয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সকালে ওই ছাত্রাবাসে গিয়ে একাধিক কর্মচারীর কাছে জানতে চাইলে এক বাক্যে সবাই বলেন, এসি লাগানো ২২৮ নম্বর কক্ষে জাকির হোসেন থাকেন। ওই সময় কক্ষটিতে তালা দেওয়া ছিল। তবে অন্যান্য শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চাইলে তাঁরাও নিশ্চিত করেন, এসি লাগানো কক্ষেই জাকির থাকেন। আর জাকিরের নামে বরাদ্দ করা ৩২৭ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, বাইরে তাঁর ছবি সংবলিত একটি পোস্টার লাগানো রয়েছে। কক্ষের দরজা খোলা, ভেতরে কাউকে পাওয়া যায়নি। কক্ষে এক সেট সোফা পাতা রয়েছে। তৃতীয় তলার ওই ব্লকের শিক্ষার্থীরাও নিশ্চিত করেন, জাকির এখন এসি লাগানো দ্বিতীয় তলার ওই কক্ষটিতে থাকেন।

■ ছাত্রাবাসে কবে কীভাবে এসি লাগানো হয়েছে, জানে না কর্তৃপক্ষ।

■ চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা নেওয়ার অভিযোগ।

■ মাদক সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল।

শহীদ কাজী নূরুন্নবী ছাত্রাবাসের ৩২৭ নম্বর কক্ষে বহিরাগত ব্যক্তিদের নিয়ে অবস্থান করার অভিযোগে ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক গত বছর জাকিরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওই কক্ষে বহিরাগত ব্যক্তিদের নিয়ে মাদক সেবনের অভিযোগও রয়েছে।

জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ নওশাদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, জাকির রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় এখনো তিনি বের হতে পারেননি। ইতিমধ্যে তিনি রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। তাঁর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে তাঁরা অস্বস্তিতে আছেন। অধ্যক্ষ বলেন, জাকির হোসেনের কক্ষে এসি ব্যবহারের বিষয়ে তাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ওই কক্ষের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে বলা হয়েছে।

অধ্যক্ষ বলেন, যে কক্ষেই এসি থাকুক, সেটি অবশ্যই জাকির হোসেনের। তিনি সেই কক্ষেই থাকেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। বহিরাগত ব্যক্তিদের নিয়ে থাকার অভিযোগে ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক তাঁকে নোটিশ দিয়েছেন।

তবে ছাত্রাবাসে এসি লাগানো কক্ষে থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে জাকির প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর নামে ৩২৭ নম্বর কক্ষ বরাদ্দ। সেখানে এসি নেই। ২২৮ নম্বর কক্ষ ছাত্রলীগের একটা ‘এজমালি’ কক্ষ। সেখানে সংগঠনের মিটিং করা হয়। সবাই এসে বসেন। সেখানে মাঝেমধ্যে থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি।

চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার আক্কেলপুর গ্রামের মিনহাজুর আবেদিনকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনে চাকরি দেওয়ার নামে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিরের বিরুদ্ধে। চাকরি দিতে না পেরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব টাকা পরিশোধের একটি অঙ্গীকারনামায় সই করেন জাকির।

এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, মিনহাজ তাঁর খালাতো ভাই। তাঁর সঙ্গে অন্য একটি লেনদেন ছিল। সেটি তিনি মিটিয়ে দিয়েছেন।

ওই অঙ্গীকারনামার একটি কপি প্রথম আলোর হাতে এসেছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে ওই টাকা নিয়েছিলেন জাকির হোসেন।

জাকির হোসেনের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাজেকোলা গ্রামে। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর বাবা আমির আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনি কৃষক। তাঁর ছেলে ডাক্তারি পড়ছে; আবার দলের একটা বড় পদ পেয়েছে। এই জন্য এলাকার লোকজন ছেলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।’

মাদকে ভাইরাল

সম্প্রতি জাকিরের মাদক সেবনের একটি ভিডিও ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এতে দেখা যায়, রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালীর এক নেতার চেম্বারে বসে মাদক সেবন করছেন তিনি। ওই ভিডিও চিত্রের ব্যাপারে জাকির বলেন, কাটাখালীর ওই নেতার চেম্বারে গেলে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সবাই মিলে প্রকাশ্যে কোমল পানীয় সেবন করেছিলেন। ভিডিওতে দেখাও যাচ্ছে না, সেটি কিসের বোতল। ষড়যন্ত্র করে এটিকে মাদক বলা হচ্ছে।