সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের তিনজন মারা যান। আহত হন পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন। পরে পুলিশের অভিযানে চিনিকলের জমিতে গড়ে ওঠা বসতি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করা হয়।

এ ঘটনায় স্বপন মুর্মু নামের এক ব্যক্তি একই বছরের ১৬ নভেম্বর অজ্ঞাতনামা ৬০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। থোমাস হেমব্রম নামের আরেকজন চিনিকলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপজেলার সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাকিল আহম্মেদসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে আরেকটি মামলা করেন।

মামলার অগ্রগতি

আদালত সূত্রে জানা গেছে, সাঁওতালদের করা মামলা দুটি একত্র করে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই গাইবান্ধা ইউনিটের তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই ১১ আসামির নাম বাদ দিয়ে ৯০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী থোমাস।

ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর আদালত অধিকতর তদন্ত করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। সিআইডি ২০২০ সালের ২ নভেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে আবার নারাজি আবেদন করেন থোমাস। ওই নারাজির ওপর কয়েক দফায় শুনানি হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের ৪ অক্টোবর শুনানির ওপর আদেশ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদালত কোনো আদেশ দেননি। আগামী বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি আদেশের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য আছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পিবিআই ও সিআইডি—উভয় কর্তৃপক্ষ মূল আসামিসহ ১১ জনকে বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। ছয় বছরেও বিচারকাজ শেষ না হওয়ায় সাঁওতালরা চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন।

সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাক্সে বলেন, ঘটনার ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। শুরু হয়নি বিচারকাজ। নভেম্বরের ঘটনায় অনেকে পঙ্গু হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। তাঁরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তিনি আরও বলেন, সরকারের নানা আশ্বাসের কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টো তাঁদের পূর্বপুরুষের জমিতে ইপিজেড স্থাপন করে সাঁওতালদের উচ্ছেদের পাঁয়তারা চলছে।

‘সাঁওতালদের নিয়ে ইপিজেড করা হবে’

সাহেবগঞ্জ এলাকায় রংপুর চিনিকলের আওতায় ১ হাজার ৮৪২ একর জমি আছে। ওই জমিতে উৎপাদিত আখ ওই চিনিকলে মাড়াই হতো। চিনিকলটিতে আখমাড়াই বন্ধ হলে সাঁওতালরা ২০১৬ সালের ঘটনার পর থেকে ওই জমিতে চাষাবাদ করে আসছেন।

এ অবস্থায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষকে (বেপজা) ইপিজেড বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বেপজা সাহেবগঞ্জ এলাকায় ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু স্থানীয় সাঁওতালরা ইপিজেডের বিরোধিতা করে আন্দোলন করে যাচ্ছেন।

রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, ইপিজেড হলে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। স্থানীয় সাঁওতালরা সেখানে অগ্রাধিকার পাবেন। এ ছাড়া বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান বলেন, সাঁওতালদের নিয়েই ইপিজেড করা হবে। চিনিকলের সম্পূর্ণ জমিতে ইপিজেড হবে না। প্রায় ৫৫০ একর জমিতে ইপিজেড হবে। ইপিজেড নির্মাণে চিনিকল কর্তৃপক্ষ ৪৫০ একর জমি হস্তান্তর করেছে।

বিচারের দাবিতে কর্মসূচি

এদিকে সাঁওতাল হত্যা দিবস উপলক্ষে আজ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন সাঁওতালরা। সকালে নিহত সাঁওতালদের অস্থায়ী শহীদবেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মোমবাতি প্রজ্বালন করা হবে। পরে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর সড়কের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটামোড় ও স্থানীয়ভাবে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

দিবসটি উপলক্ষে গতকাল শনিবার সকালে গাইবান্ধা শহরের গানাসাস মার্কেটের সামনে সমাবেশ হয়েছে। সমাবেশের শুরুতে নিহত মঙ্গল মার্ডি, রমেশ টুডু ও শ্যামল হেমব্রমের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এর আগে একটি শোক র‌্যালি শহর প্রদক্ষিণ করে। কর্মসূচিতে দাবিদাওয়া–সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন ও কালো পতাকা নিয়ে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ, সামাজিক সংগ্রাম পরিষদ, বেসরকারি সংস্থা জনউদ্যোগ।

সমাবেশে সাঁওতাল নেতা ফিলিমন বাক্সের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মারুফ, আদিবাসী বাঙালি সংহতি পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম, জনউদ্যোগের সদস্যসচিব প্রবীর চক্রবর্তী, সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবির, সদর উপজেলা আদিবাসী বাঙালি সংহতি পরিষদের আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী, আদিবাসী নেত্রী প্রিসিলা মুর্মু প্রমুখ। বক্তারা অবিলম্বে সাঁওতাল-বাঙালিদের সেচসুবিধার জন্য বিদ্যুৎ–সংযোগ, সমতলের সাঁওতালদের ভূমি সংকট নিরসনে পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনসহ সাত দফা বাস্তবায়নের দাবি জানান।

আন্দোলন ঘিরে বিভক্ত সাঁওতালরা

জমি উদ্ধার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাঁওতালরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একটি সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, যার নেতৃত্বে আছেন ফিলিমন বাক্সে ও রেজাউল করিম মাস্টার। একই সংস্থার আরেকটি কমিটি গঠিত হয়েছে, যার সভাপতি র্বানা বাস ও সাধারণ সম্পাদক জাফরুল ইসলাম। দুটি কমিটি চিনিকলের জমিতে ইপিজেড নির্মাণের বিরোধিতা করে আন্দোলন করছে।