‘চার কারণে’ সাতক্ষীরার সব আসনে বিএনপির ভরাডুবি
সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের পরাজিত করে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। এর মধ্যে দুটি আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বাকি দুটি আসনে কার্যত প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। বিশেষ করে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম ও তরুণ প্রার্থী মো. মরিুজ্জামানের পরাজয় দলটির নেতা-কর্মীদের হতাশ করেছে। বিপরীতে বড় ব্যবধানে জয় পাওয়ায় জামায়াত নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা গেছে।
স্থানীয় নেতা-কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিএনপির এই ভরাডুবির পেছনে চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, প্রার্থী নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্ত ও বিদ্রোহী প্রার্থী, ৫ আগস্টের পর একটি সময় পর্যন্ত কিছু নেতা-কর্মীর চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট গঠন এবং নারী ভোটারদের নিজেদের পক্ষে নিতে না পারা।
রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরাকে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ধরা হয়। চার বিজয়ীর মধ্যে সাতক্ষীরা-৪ আসনের গাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া অন্য তিনজন এবারই প্রথম প্রার্থী হয়ে জয় পেয়েছেন। নতুনদের মধ্যে আছেন সাতক্ষীরা-১ (কলারোয়া-তালা) আসনে মো. ইজ্জত উল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে আব্দুল খালেক এবং সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি) আসনে মুহা. রবিউল বাশার।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া)
এই আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও হেভিওয়েট প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম ২৩ হাজার ৭৭৭ ভোটে পরাজিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯৫ ভোট। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ পেয়েছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭২ ভোট।
স্থানীয় লোকজনের ধারণা ছিল, জেলার অন্য আসনে হারলেও এ আসনে জয় পাবে বিএনপি। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়িঘর ও প্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাটের অভিযোগ ওঠে, যার সঙ্গে বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল। এসব নিয়ন্ত্রণে হাবিবুল ইসলাম পুরোপুরি সফল হননি। পাশাপাশি নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার কার্যকর পাল্টা যুক্তি তুলে ধরতে পারেনি দলটি।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা)
এ আসনে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬৬ ভোটের ব্যবধানে জয় পান জামায়াতের আব্দুল খালেক। প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল রউফ পেয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ২৯৩ ভোট।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের মতে, আগে থেকেই এ আসনে তাঁদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল। প্রার্থী হিসেবে আব্দুল রউফকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। আব্দুল আলিম ও তাজকিন আহমেদ মনোনয়ন দাবি করে আন্দোলন করেন। শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে একসঙ্গে কাজ করলেও ভেতরে বিরোধ ছিল। এ ছাড়া কুলিয়া এলাকার চিংড়ি রেণু সিন্ডিকেট নিয়েও বিতর্ক ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি)
আসনটিতে ৭৮ হাজার ৮৫৪ ভোটের ব্যবধানে স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) প্রার্থীকে হারিয়ে জয় পান জামায়াতের রবিউল বাশার। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৩৩ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদুল আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৭৯ ভোট এবং বিএনপি প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৮১৯ ভোট।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহিদুল আলম দীর্ঘদিন এলাকায় সক্রিয় থাকলেও দলীয় মনোনয়ন পান কাজী আলাউদ্দীন। এতে বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে টানা আন্দোলন হয়। শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না বদলানোয় শহিদুল আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। পরে তাঁর পক্ষে কাজ করার অভিযোগে বিএনপির ৬৭ জন নেতাকে দলীয় সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীই এ আসনে বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর)
এ আসনে ২১ হাজার ৪৮৭ ভোটের ব্যবধানে জয় পান জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট। বিএনপির মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট।
স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের দাবি, আগে থেকেই এ আসনে দলীয় কোন্দল ছিল। মনিরুজ্জামানকে প্রার্থী করায় দলের একটি অংশ অসন্তুষ্ট ছিল। তাঁরা প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও ভেতরে ভেতরে নিষ্ক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে গোপনে প্রচার চালানোর অভিযোগও আছে। পাশাপাশি বালু সিন্ডিকেটের প্রভাবও নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
বিএনপির নেতা–কর্মীরা আরও বলেন, নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার বিরুদ্ধে বিকল্প হিসেবে শক্ত কোনো যুক্তি দাঁড় করাতেও পারেননি। এ ছাড়া শ্যামনগরের বালি সিন্ডিকেটের প্রভাব প্রতিপত্তিও প্রভাব ফেলেছে।
বিএনপির প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা কথা বলতে চাননি। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর জামায়াত সংগঠন গোছাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে এবং তাঁদের মধ্যে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁরা বিভিন্ন কৌশলে নারী ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে পেরেছেন।
আবু জাহিদের ভাষ্য, বিএনপি প্রার্থী মনোনয়ন দিতে দেরি করেছে। ৩ ডিসেম্বর মনোনয়ন দেওয়া শুরু হলেও ২৭ ডিসেম্বর চূড়ান্ত হয়। এতে সময় নষ্ট হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যা মেটাতে সময় লেগেছে। প্রার্থী নির্বাচনেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল বলে তিনি স্বীকার করেন।