‘হঠাৎ বিকট শব্দ, মাটি চাপা পড়ে চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না’

পাহাড়ধসে বাবা ও ছোট বোনকে হারানো সেই কথা বলছিল বিবি কুলসুম আক্তার। গতকাল চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহরের আই ডব্লিউ কলোনিতেছবি: সৌরভ দাশ

ঘরে টাঙানো বাবার ছবিটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল বিবি কুলসুম আক্তার। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে উঠে দাঁড়াল। এরপর নিয়ে গেল ঘরের বাইরে। আঙুল তুলে দেখাল পাহাড়ের পাদদেশের একটি জায়গা। বলল, ‘ওখানেই আমাদের ঘর ছিল। ওখানেই বাবা আর আমার ছোট বোন মারা গিয়েছিল।’

চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহরের আইডব্লিউ কলোনিতে গতকাল বুধবার দুপুরে কথাগুলো বলছিল নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী কুলসুম। বয়স এখন ১৪ বছর। কিন্তু তিন বছর আগের সেই ভোরের প্রতিটি মুহূর্ত এখনো স্পষ্ট মনে আছে তার।

পুরো ঘটনা জানতে ফিরে যেতে হবে তিন বছর আগে। দিনপঞ্জিকায়—২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট। ভোর তখন সাড়ে পাঁচটা। বাইরে আলো ফোটেনি। টিনের চালের ওপর একটানা ভারী বৃষ্টির শব্দ, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপটা। ঘরের ভেতরে গভীর ঘুমে ছিল পুরো পরিবার। হঠাৎ অদ্ভুত এক শব্দে ঘুম ভেঙে যায় কুলসুমের। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়ে। একই সঙ্গে পাশের দেয়াল ভেঙে এসে চাপা দেয় তাদের ছোট্ট ঘরটিকে। মুহূর্তেই অন্ধকারে ঢেকে যায় সবকিছু।

কুলসুম বলছিল, ‘ হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। মাটি চাপা পড়ে চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমার গায়ের ওপরও ইট পড়েছিল। আমি শুধু মা আর বাবাকে ডাকছিলাম।’

একটি খাটেই ঘুমাচ্ছিল পুরো পরিবার। বাবা মোহাম্মদ সোহেল, মা শরীফা বেগম, সাত মাস বয়সী ছোট বোন বিবি জান্নাত আর কুলসুম। দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান সোহেল ও ছোট্ট জান্নাত। ধ্বংসস্তূপের আরেক পাশে আটকে ছিলেন শরীফা ও কুলসুম।

ঘরের ভেতর বসে মেয়ের কথা শুনছিলেন শরীফা বেগম। এতক্ষণ নীরব ছিলেন। এবার ধীরে ধীরে যোগ করলেন সেদিনের স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশীরা এসে আমাকে আর বড় মেয়েটাকে টেনে বের করেন। কিন্তু আমার স্বামী আর ছোট মেয়েটাকে বের করা যায়নি। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে।’

চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহরের আই ডব্লিউ কলোনিতে ঝুঁকি নিয়ে গড়ে ওঠা বসতি
ছবি: প্রথম আলো

কথা বলতে বলতে থেমে যান শরীফা। আঁচল দিয়ে চোখ মোছেন। কিছুক্ষণ পর আবার বলেন, ‘সেদিনের পর থেকে বৃষ্টি আমার কাছে আতঙ্ক। আকাশ কালো হলেই বুক ধড়ফড় করে। মনে হয়, আবার যদি এমন কিছু হয়।’

সেই ভয় কেটে যায়নি কুলসুমেরও। সে জানায়, ‘রাতে বৃষ্টি হলে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তখন মনে হয়, আবার পাহাড় ভেঙে পড়বে। আমি একা ঘরে থাকতে পারি না।’

দুর্ঘটনার পর পাহাড়ের একটি অংশে লোহার বেষ্টনী দিয়েছে প্রশাসন। সেই বেষ্টনীর পাশেই ছোট দুটি কক্ষের একটি ঘরে এখন থাকেন শরীফারা। আগের জায়গা থেকে কিছুটা দূরে এলেও পাহাড় এখনো চোখের সামনেই। পাহাড়ধস শুধু কুলসুমের কাছ থেকে বাবা আর ছোট বোনকে কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছে পুরো সংসারের জীবনও।

সোহেল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ষোলশহরে একটি ছোট চায়ের দোকান চালাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই দোকানের দায়িত্ব নেন শরীফা। ভোরে দোকান সামলান, আবার কয়েকটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজও করেন। তবু সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়।

আরও পড়ুন
পাহাড়ধসের ঝুঁকির মধ্যেই বসবাস। চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহরের আই ডব্লিউ কলোনিতে
ছবি: প্রথম আলো

সবচেয়ে বেশি চিন্তা মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে। শরীফা বলছিলেন, ‘ওর বাবার সময় মাস্টার ছিল। এখন আর রাখতে পারছি না। মেয়েটাকে লেখাপড়া শেখাতে চাই। কিন্তু সব খরচ একা চালানো খুব কঠিন।’ মা কথা বলছিলেন। এ সময় এক প্রতিবেশী এসে জানালেন, ষোলশহরের পাশের মেয়র গলির মুক্তিযোদ্ধা পাহাড়ে ধসে ১৩ বছর বয়সী সামিয়া ইসলাম নামের এক শিশুর মৃত্যুর সংবাদ। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় পাহাড় ধসে প্রাণ হারায় সে। খবরটি শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে সে। এরপর খুব আস্তে বলে, ‘আরও একজন মারা গেছে।’

এরপর আর কোনো কথা বলে না কুলসুম। আবার বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘরের বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি পড়ছে।

আরও পড়ুন