গাজীপুরে শ্রমিক–পুলিশ দফায় দফায় সংঘর্ষ, আহত ৩০; পুলিশের গাড়িসহ ১৫টি যানবাহন ভাঙচুর
তৈরি পোশাক খাতে ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের একটি গাড়িসহ কমপক্ষে ১৫টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আজ শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ইন্টারস্টপ কারখানার শ্রমিকেরা। পরে আরও আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভে অংশ নেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়।
আন্দোলনরত শ্রমিকেরা বলেন, বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আগের মতো ওভারটাইমের সুযোগও নেই। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়লেও তাঁদের বেতন বাড়েনি। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা।
ইন্টারস্টপ অ্যাপারেল লিমিটেড কারখানার লাইনম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সারা দিন পরিশ্রম করে যে বেতন পাই, তা দিয়ে এখন আর সংসার চলে না। চাল, ডাল, তেলসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ আমাদের বেতন সেই আগের জায়গায় পড়ে আছে। বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমেছি। আমরা কাজ করতে চাই, কিন্তু পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার মতো বেতনও তো পেতে হবে।’
একই কারখানার সুইং অপারেটর পারভীন আক্তার বলেন, ‘বাড়িভাড়া, বাজার খরচ, সন্তানের পড়াশোনা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগে ওভারটাইম করে কিছু বাড়তি আয় হতো, এখন সেই সুযোগও কমে গেছে। ৩০ হাজার টাকা বেতন করা আমাদের অনেক দিনের দাবি। দাবি না মানা হলে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’
পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। শ্রমিকদের দাবি, ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। তবে দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে হবে।
শিল্প পুলিশ, কারখানার শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুই সপ্তাহ ধরে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাকসহ বিভিন্ন এলাকায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করছেন। এর মধ্যে সরকার শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপরও বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে।
শনিবার দুপুরে টিফিন বিরতির সময় কাজে যোগ না দিয়ে ইন্টারস্টপ কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নেন। পরে আশপাশের ময়লা-আবর্জনার বস্তা রাস্তায় ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করেন তাঁরা। একপর্যায়ে পাশের ডিভাইন টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিকেরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। এতে চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। ছুটি পাওয়া শ্রমিকদের একটি অংশও বিক্ষোভে যোগ দেয়।
খবর পেয়ে থানা-পুলিশ ও শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। বেলা আড়াইটা থেকে অবরোধ শুরু হলে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকেরা। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিতে লাঠিপেটা শুরু করে। এ সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় পুলিশের একটি গাড়ির সামনের কাচসহ ১৫টি যানবাহন ভাঙচুর করে।
পরে সন্ধ্যা সাতটার দিকে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ শুরু করে। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় ৩০ জন শ্রমিক ও পুলিশের সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুল ইসলাম।
আহত শ্রমিকেরা স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন। ডিভাইন টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিক কবির হোসেন বলেন, ‘পুলিশের লাঠিপেটায় আমাদের ২০-২৫ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। টিয়ার শেলে আহত হয়েছেন অনেকে। আজ চলে গেলেও কাল (রোববার) সকাল থেকে আবার আমাদের আন্দোলন শুরু হবে।’
অবরোধে ভোগান্তি
এর আগে বিকেলে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় কথা হয় বাসচালক হারুন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চন্দ্রা এলাকায় বসে আছি। এর আগে গত বৃহস্পতিবারও একই পরিস্থিতি হয়েছিল। পোশাকশ্রমিকেরা প্রায়ই এভাবে রাস্তা বন্ধ করে রাখলে আমাদের কী হবে?’ যাত্রী মো. কাদের মিয়া বলেন, ‘জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়া প্রয়োজন। চন্দ্রায় এসে বাস থেকে নেমে বাধ্য হয়ে হেঁটে যাচ্ছি।’
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। শ্রমিকদের দাবি, ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। তবে দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে হবে। মানুষের জানমালের ক্ষতি বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত অন্তত ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।