মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপে আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থান লক্ষ্য করে টানা বিমান হামলা চালাচ্ছে দেশটির সরকারি জান্তা বাহিনী। রাতভর যুদ্ধবিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ ও গোলাবর্ষণের শব্দে কেঁপে উঠছে টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্ত এলাকাগুলো। সংঘাত তীব্র হওয়ায় নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নাফ নদী ও সীমান্তজুড়ে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও নেটংপাড়া সীমান্ত এলাকা ঘুরে থমথমে পরিস্থিতি দেখা গেছে। সীমান্তে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত। স্থানীয় জেলেরা সতর্কতার সঙ্গে নাফ নদীতে মাছ ধরছেন। সীমান্তজুড়ে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের অতিরিক্ত টহল চোখে পড়ে।
সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তে (আকিয়াব) থেকে যুদ্ধবিমান উড়ে এসে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের মংডুতে আরাকান আর্মির অবস্থানে হামলা চালিয়ে ফিরে যাচ্ছে। প্রতিবার একসঙ্গে পাঁচ থেকে ছয়টি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় নাফ নদীর এপারের ঘরবাড়িও কেঁপে উঠছে।
সূত্রগুলো জানায়, গতকাল বুধবার রাত সোয়া ৯টার দিকে মংডু টাউনশিপে বিমান হামলা শুরু করে জান্তা বাহিনী। রাত সোয়া ১১টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টায় দুটি যুদ্ধবিমান অন্তত ২৭ দফা হামলা চালায়। আরাকান আর্মিও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। টেকনাফ সীমান্তের বাসিন্দারা ওপারের আগুনের ঝলকানি ও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ স্পষ্টভাবে দেখতে ও শুনতে পান।
উখিয়া-৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল রাতে রাখাইনের অভ্যন্তরে বিমান হামলার শব্দ শোনা গেলেও আজ সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সীমান্ত পরিস্থিতি কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদীতে অতিরিক্ত টহল দেওয়া হচ্ছে। আজ বিকেল পর্যন্ত সীমান্তে গুলি এসে পড়া বা অনুপ্রবেশের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
সবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, সংঘাত আরও বাড়লে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা শুরু হতে পারে। একই আশঙ্কার কথা জানান হোয়াইক্যং ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল চৌধুরীও।
উখিয়ার একটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের নেতা মো. জুবায়েরের দাবি, হামলায় বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে স্থলপথে আরাকান আর্মির সঙ্গে তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষও চলছে। এতে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। তিনি আশঙ্কা করেন, যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয়ের চেষ্টা করতে পারে।
২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর টানা ১১ মাসের যুদ্ধের পর আরাকান আর্মি মংডু, বুথিডং ও রাথেডংসহ রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। বর্তমানে রাজধানী সিত্তে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাম্প্রতিক বিমান হামলাগুলো সেখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে বলে সীমান্ত সূত্র জানিয়েছে।
মিয়ানমারভিত্তিক কয়েকটি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুথিডং টাউনশিপের একটি মুসলিম গ্রামে বিমান হামলায় হতাহতের পাশাপাশি অন্তত ১০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে ১৭ ও ২৪ জুনও মংডু ও কিয়াউকতাও এলাকায় পৃথক বিমান হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
টেকনাফ-২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মো. অনীক চৌধুরী বলেন, আজ দিনভর সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড।