চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছাটা ছোট থেকেই কি ছিল?

ফারিহা আফরিন: আমি ছোট থেকে অসুখে ভুগতাম। আমার শ্বাসকষ্ট ছিল। মাঝেমধ্যেই শিশুরোগ চিকিৎসকের কাছে আমাকে নেওয়া হতো। প্রতিদিন নেবুলাইজার দিতে হতো। অবশেষে চিকিৎসকের পরামর্শে একটা নেবুলাইজার মেশিন কিনে নেওয়া হয়। ওটা এখনো বাড়িতে আছে। আমি দেখতাম একজন চিকিৎসক কীভাবে মানুষের সেবা করছেন—আমার ভালো লাগত। তখন থেকে ভাবতাম, বড় হয়ে আমিও চিকিৎসক হব।

অসুস্থতার কারণে আপনার শিশুকাল তো ভালো কাটেনি।

ফারিহা আফরিন: মোটেই না। বাবা চাকরি করতেন। বাইরে থাকেন। মা-ও কলেজে চাকরি করতেন। ছোটবেলায় আমাকে একাই বাসায় থাকতে হতো। একদম ভালো লাগত না। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। বেশি বেশি পানি নাড়তাম। এ জন্যই বোধ হয় শ্বাসকষ্টের অসুখটা হয়েছিল। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠা পর্যন্ত আমার ওই অসুখটা ছিল। শেষ পর্যন্ত পরিবারকে সময় দেওয়ার জন্য বাবা চাকরিটাই ছেড়ে দেন। কিন্তু ওই একাকিত্বের কারণে এখনো আমার কোনো বন্ধু হয় না। কেউ কথা বললে তার সঙ্গে বলি। নিজের থেকে বলতে ইচ্ছে করে না।

আপনার স্কুলজীবন কেমন ছিল?

ফারিহা আফরিন: ভীষণ বাজে! বিদ্যালয়ে আমি দিবা শাখার শিক্ষার্থী ছিলাম। প্রভাতি শাখার শিক্ষার্থীদের বেশি মেধাবী মনে করে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। আর আমি একে তো দিবা শাখায় পড়ি, তারপর আমার রোল নম্বর অনেক পেছনের দিকে ছিল। যেমন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৩৮। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে ২৮। নবম শ্রেণির পরীক্ষার সময় অসুস্থতার কারণে আরও পেছনে পড়ে গেলাম। রোল নম্বর হয়ে গেল ৩৫। কেউ গুরুত্ব দেয় না। সহপাঠীরা বুলিং করে। তখন আমি আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে উঠেছিলাম। শুধু করিনি এই ভেবে যে ধর্মে এটাকে মহাপাপ বলা আছে। দোজখে যেতে হবে, তাই!

ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা ছিল, তো তখন থেকেই পড়াশোনায় জোর দেওয়া হয়নি কেন?

ফারিহা আফরিন: না। আমি মনে করতাম, মেডিকেলে পড়তে হলে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে হবে। তখনই আসল পড়াশোনা শুরু করব। তার আগে শিশুকালটা উপভোগ করব। নবম শ্রেণিতে উঠে পড়াশোনা শুরু করলাম, কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষা দেওয়ার সময় আমার হাত অচল হয়ে গেল। বাথরুমে বসে আর উঠতে পারলাম না। আমাকে ধরে তোলা হলো। তবু জেদ ধরলাম পরীক্ষা দেবই। রিকশায় করে আমাকে পরীক্ষার হলে নেওয়া হলো। একজন সপ্তম শ্রেণির মেয়েকে শ্রুতলেখক হিসেবে দেওয়া হলো। মেয়েটি রাজি হচ্ছিল না। শিক্ষকদের কথায় বাধ্য হয়ে শ্রুতলেখনে সহযোগিতা শুরু করেছিল। তা-ও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে আর বলতে পারলাম না। উচ্চতর গণিত, আইসিটি ও পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা দিতে পারলাম না। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার নম্বরের সঙ্গে গড় করে আমাকে পাস করিয়ে দেওয়া হলো।

কত দিন অসুস্থ ছিলেন?

ফারিহা আফরিন: প্রায় পাঁচ মাস পর আমি বই হাতে নিতে পেরেছি।

আইসিইউতে থাকার দিনগুলো মনে করতে পারেন?

ফারিহা আফরিন: আমি ভয়ংকর ভাইরাস গুলেনব্যারি সিনড্রোম বা জিবিএসে আক্রান্ত হয়েছিলাম। তখন তো আমি মৃতপ্রায় ছিলাম। মা-বাবার কাছে শুনেছি। পাঁচ নম্বর বেডের লোক কে—এই ডাক পেলেই বাবা ছুটে যেতেন। হয়তো লাশ নেওয়ার জন্য ডাকছেন! প্রায় এমন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল শেষ চিকিৎসা হিসেবে একটা ইনজেকশন দেওয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিটি ডোজের দাম দেড় লাখ টাকা। তাৎক্ষণিক জোগাড় করতে হবে। এতে হয় কাজ হবে, না হলে রোগী মারা যাবে। ঝুঁকি নিয়ে দিতে হবে। সেই ইনজেকশন দেওয়া হলো। প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ। জমি বিক্রি, ধারকর্জ—পরিবার প্রায় নিঃস্ব। কিন্তু আমি প্রাণ ফিরে পেলাম।

এই সময়ের অনুভূতিটা কেমন ছিল?

ফারিহা আফরিন: আমি আগে আত্মহত্যাপ্রবণ ছিলাম। এখন মনে হয় জীবন অনেক সুন্দর। আমি বাঁচতে চাই। সুন্দর পৃথিবীটা আরও দেখতে চাই।

মেডিকেলে ভর্তির সুযোগের খবর পেয়ে প্রথমেই মিষ্টিটা আইসিইউ ইনচার্জের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা কেন মনে হয়েছিল?

ফারিহা আফরিন: তাঁকে আমার খুব দায়িত্বশীল চিকিৎসক বলে মনে হয়েছে; এ জন্যই।