লিফট জালিয়াতির তদন্তে এক মাস পরে এল গণপূর্তের উচ্চ কারিগরি কমিটি

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালফাইল ছবি

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) আলোচিত সেই লিফট জালিয়াতির তদন্তে এসেছে গণপূর্তের উচ্চ কারিগরি কমিটি। আজ সোমবার দুপুরে কমিটির সদস্যরা সরেজমিন পরিদর্শন করেন।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক গণপূর্তের রাজশাহী জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ওম প্রকাশ নন্দী, সদস্যসচিব গণপূর্তের ঢাকার ই/এম সার্কেল-২–এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম এবং সদস্য গণপূর্তের প্রকিউরমেন্ট ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশেক আহমেদ শিবলী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন গণপূর্তের রাজশাহী জোন-২–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান।

গত ২৫ জুন গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান এই উচ্চতর কারিগরি কমিটি করে দেন। এ কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে অধিকতর যাচাই-বাছাই করে মতামতসহ একটি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু সেই উচ্চতর কারিগরি কমিটি হাসপাতালে এল নির্ধারিত সময়ের এক মাসের বেশি সময় পর।

কারিগরি কমিটির সদস্যরা আজ দুপুর ১২টার পর হাসপাতালে এসে প্রথমেই পরিচালকের কক্ষে যান। লিফট-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাগজপত্রও দেখেন। এরপর বেরিয়ে তাঁরা লিফট দেখতে যাচ্ছিলেন। এ সময় টেলিভিশনের ক্যামেরা দেখেই তাঁরা আবার ঘুরে গিয়ে পরিচালকের কক্ষে ঢুকে পড়েন। একটু পর হাসপাতালের একজন নিরাপত্তাকর্মী এসে সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, তাঁরা কেন এসেছেন, কী করবেন। কারণ জেনে তিনি ভেতরে গিয়ে হাসপাতালের পরিচালক ও গণপূর্তের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান।

আরও পড়ুন

এরপর হাসপাতালে দায়িত্বরত আনসারের প্লাটুন কমান্ডার এক সাংবাদিককে ফোন করে গণপূর্তের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সরে জরুরি বিভাগের কাছে গিয়ে বসার অনুরোধ জানান। এর মধ্যেই হাসপাতাল পুলিশ বক্স থেকে দুজন পুলিশ সদস্য এসে একই অনুরোধ করেন। হাসপাতালে আসতে মুখপাত্রের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা তাঁরা জানতে চান। অনুমতি নেওয়া হয়েছে জানালে একটু পর ফোন করেন মুখপাত্র শেখ শামিম আহমেদ। তিনিও অনুরোধ করেন পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে থেকে সরে জরুরি বিভাগে তাঁর কক্ষে যেতে। সাংবাদিকেরা সরে গেলে কর্মকর্তারা লিফট পরিদর্শনে যান।

লিফট পরিদর্শন করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে কারিগরি কমিটির আহ্বায়ক ওম প্রকাশ নন্দী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বিষয়টি একটু দেখি। তারপর বলব।’ এর আগে হাসপাতাল ও গণপূর্তের তদন্তের দুই রকম ফলাফলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওইটাই আমরা দেখতে আসছি। এটার ভেতরে ভিন্নতা কেন হলো, সেটাই আমরা জানার জন্য এসেছি।’

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের লিফট জালিয়াতির ঘটনার তদন্তে গণপূর্তের উচ্চতর কারিগরি কমিটি। সোমবার দুপুরে
ছবি : প্রথম আলো

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের একাংশের পাঁচতলায় নতুন করে আইসিইউ ইউনিট নির্মাণ করা হয়। সেখানে ১ কোটি ১৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় একটি বেড কাম প্যাসেঞ্জার লিফট স্থাপনের কাজ পায় ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জাকির হোসেন ফায়ার প্রটেকটেড বেড কাম প্যাসেঞ্জার লিফটের বদলে ২০২৪ সালে একটি সাধারণ প্যাসেঞ্জার লিফট স্থাপন করে দেন।

বিষয়টি জানাজানি হলে গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে লিফটটি নিম্নমানের প্রমাণ পায়। এরপর ২০২৪ সালের জুন মাসে লিফটি অপসারণ করা হয়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর আরেকটি লিফট সরবরাহ করে। কিন্তু এটিও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী পায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাই লিফটটি লাগাতে দেওয়া হয়নি। লিফটটি এখনো হাসপাতালের এক কোণে পড়ে আছে।

১ কোটি ১৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় একটি বেড কাম প্যাসেঞ্জার লিফট স্থাপনের কাজ পায় ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফায়ার প্রটেকটেড বেড কাম প্যাসেঞ্জার লিফটের বদলে ২০২৪ সালে একটি সাধারণ প্যাসেঞ্জার লিফট স্থাপন করা হয়।

এদিকে গত বছরের ২ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় লিফট সরবরাহের দুই দিন পর হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের প্রধান আবু হেনা মোস্তফা কামালকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে চিকিৎসক ছাড়াও গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি রাখা হয়। তদন্ত শেষ করে গত ১ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করে কমিটি। এতে আগের লিফটের চেয়ে আরও ভয়াবহ জালিয়াতি ধরা পড়ে।

ওই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আগেই গণপূর্ত বিভাগ একটি কারিগরি কমিটি করে লিফট বিষয়ে তদন্ত করে। কারিগরি কমিটির আহ্বায়ক গণপূর্ত বিভাগের ডিজাইন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম এ বছরের ২৮ জানুয়ারি নির্বাহী প্রকৌশলীকে একটি চিঠি দেন। তিনি লেখেন, সরবরাহ করা লিফটের সবকিছুই দরপত্রের স্পেসিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এসেছে। লিফট স্থাপন, কমিশনিং ও পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা নেই। তবে গণপূর্তের ওই কমিটিতে হাসপাতালের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। হাসপাতাল ও গণপূর্তের দুই ধরনের প্রতিবেদন নিয়ে জটিলতা আরও বাড়ে।

আরও পড়ুন