ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ড: ‘মাইনষে পাড়াইয়্যা আমার পুতটারে মাইরা হালাইছে’
‘কইলজ্যাডা ফাইট্টা যাইতাছে পুতের লাইগ্যা। মাইনষে পাড়াইয়্যা আমার পুতটারে মাইরা হালাইছে।’ গতকাল সোমবার রাতে ছেলের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকে এ কথা বলে আহাজারি করছেন বৃদ্ধ মা হাওয়া খাতুন। তাঁর ছেলে শাহাজাহান মনির (৪৫) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
স্বজনদের দাবি, গতকাল সন্ধ্যায় হাসপাতালের লিফটে আগুন লাগার পর সিঁড়ি দিয়ে স্ত্রী ও স্ত্রীর বড় বোনের সঙ্গে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে শাহাজাহান মনিরের মৃত্যু হয়।
ওই দুর্ঘটনার পর চারজনের মৃত্যুর তথ্য সামনে এলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন তা নাকচ করেছে। তবে তিনটি পরিবারের সঙ্গে প্রথম আলো যোগাযোগ করলে তারা পদদলিত হয়ে স্বজনদের মৃত্যুর দাবি করেছে।
শাহাজাহান মনির ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের নাজিমুল্লাহর ছেলে। পেশায় পল্লিচিকিৎসক শাহাজাহান ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় বাড়ির আঙিনায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে শাহাজাহানের মরদেহের দাফন হয়েছে। ছেলেকে হারিয়ে হাওয়া খাতুনের বিলাপ থামছেই না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কালকা বিকালেও পুতে মোবাইল কইরা খবর নিছে। কইলো, মা, আমার লাইগ্যা দোয়া কোরো, ভালা আছি—চিন্তা কইরো না। আমি বাড়িত আইয়্যা তোমগরে সবাইরো লইয়া রান্না কইরা খাওয়ামু। আমার কইলজ্যার টুকরা পুত বাড়িত ঠিকই আইলো, কিন্তু লাশ ওইয়াই আইলো।’
রোগীরে নিয়া এক সিঁড়ির দুই-তিন ধাপ নামার পরেই পইড়া গেছি। পরে আমি অজ্ঞান হইয়া যাই। যহন হুঁশ হইছে, তহন দেহি মাইনষে কান্দাকাটি করতাছে। আমি জিগাইছি, “আল্লাহ! আমি যে রোগী নিয়া নিচে নামবার লইছিলাম, আমার সেই মানুষ কই? মানুষের পাড়ায় পিষ্ট হইয়া মারা গেছে।হারিসা বেগম, শাহাজাহান মনিরের সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী
ঘটনার সময় শাহাজাহান মনিরের সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী হারিসা বেগম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওষুধ কিনবার লাইগা আমরা দুই বইন বাইর হইছিলাম। তখন বইন কইল, আগুন লাগছে। রোগীরে নিয়া এক সিঁড়ির দুই-তিন ধাপ নামার পরেই পইড়া গেছি। পরে আমি অজ্ঞান হইয়া যাই। যহন হুঁশ হইছে, তহন দেহি মাইনষে কান্দাকাটি করতাছে। আমি জিগাইছি, “আল্লাহ! আমি যে রোগী নিয়া নিচে নামবার লইছিলাম, আমার সেই মানুষ কই? মানুষের পাড়ায় পিষ্ট হইয়া মারা গেছে।”’
হারিসা বেগমের দাবি, ওই সময় তাঁর বোনও বুকে ব্যথা পেয়ে আহত হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে।
‘ও মিম, আমারে ধরলি না?’
শাহাজাহানের মতোই ওই আগুনের পর পদদলিত হয়ে মারা যাওয়ার দাবি করেছে কুলসুম আক্তারের (৩৫) পরিবার। তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুম ১২ দিন ধরে হাসপাতালটিতে ছেলের সঙ্গে ছিলেন। ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালটির ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। সঙ্গে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিম আক্তার।
আগুন লাগার কথা শুনে মা ও ভাইকে নিয়ে একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন মিম। এ সময় ভিড়ের মধ্যে তাঁরা পড়ে যান। মিম উঠে ভাইকে টেনে তোলেন। পরে মাকে তুলতে গেলে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়।
মিম বলেন, ‘আমার আম্মু তখন মানুষের ভিড়ের মধ্যে পড়ে গেছিল। আম্মু আমাকে একবার ডাক দিয়ে কইছে, “ও মিম, আমারে ধরলি না?” আমি তখন মানুষের চিপার মধ্যে পইড়া গেছি। পরে আবার মাকে তুলতে গেলে আমাকে দুইবার ধাক্কা দেওয়া হয়। পরে অনেক কষ্টে মাকে নিচে নামিয়ে আনি।’
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কুলসুমকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আজ সকাল ১০টার দিকে বাড়ির পাশে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়। কুলসুম শ্রমিক শহিদুল ইসলামের স্ত্রী। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের মা ছিলেন।
কুলসুমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গতকাল রাত থেকেই বাড়িতে স্বজনেরা ভিড় করেন। আজ সকালেও তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে অনেক স্বজন ও স্থানীয় লোকজন বাড়িতে আসেন।
দুর্ঘটনায় পদদলিত হয়ে কেউ মারা যায়নি—প্রশাসনের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কুলসুমের ননদ নাজমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের রোগী ১১ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। আমাদের বাচ্চাও সেখানে চিকিৎসাধীন ছিল। তাহলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কীভাবে বলছে, আমরা রোগীকে বাইরে থেকে মৃত অবস্থায় নিয়ে গেছি? এটা সত্য নয়।’
নাজমার অভিযোগ, কুলসুম মানুষের ভিড়ের মধ্যে পড়েই মারা যান। পরে গতকাল রাত ১১টার দিকে তাঁরা হাসপাতাল থেকে লাশ বাড়িতে নিয়ে যান। এ সময় স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্যসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন এবং সইও করেছেন।
নাজমা বলেন, ‘আমরা যদি বাইরে থেকে মৃত অবস্থায় রোগীকে নিয়ে গিয়ে থাকি, তাহলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন মেম্বারের (ইউপি সদস্য) কাছ থেকে সই নিল? আসলে বিষয়টি দামাচাপা (ধামাচাপা) দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
‘মাঝখানে আটকা পড়ে গেছিলাম’
ফুলবাড়িয়া উপজেলার কালাদহ ইউনিয়নের বিদ্যানন্দ গ্রামের রমজান আলী (৩৮) সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে মারা যান বলে হাসপাতালের নথিতে উল্লেখ আছে। রমজান আলী পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক ছিলেন। বুকের ব্যথা নিয়ে গতকাল সকালে প্রথমে ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে সেখান থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আগুনের সময় আতঙ্ক শুরু হলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে রমজানের মৃত্যু হয় বলে দাবি করেছেন স্বজনেরা। তিনি দুই স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক ছিলেন। তাঁর দুই স্ত্রীই সন্তানসম্ভবা। আজ বেলা আড়াইটায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফনের কথা আছে।
ঘটনার সময় রমজানের সঙ্গে থাকা স্ত্রী খাদিজা আক্তার বলেন, ‘আমিও সিঁড়ির মাঝখানে পড়ে গেছিলাম। পরে বলা হইতেছিল, নিচে না গিয়ে যার যার সিটে যান, আগুন নিভাই দিছি। তখন নিচেও যেতে পারতেছিলাম না, ওপরেও যেতে পারতেছিলাম না। মাঝখানে আটকা পড়ে গেছিলাম। ওই অবস্থাতেই মারা যায় আমার স্বামী।’
রমজান আলীর ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, তাঁর ভাই এমনিতেই হার্টের রোগী ছিলেন। চারতলা থেকে নামার সময় ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে গিয়ে সেখানেই মারা গেছেন তিনি। পরে ভাইকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখান থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডেথ গেট পাস দেয়। রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটার দিকে মরদেহ নিয়ে আসেন।
সাইফুল ইসলামের দাবি, ‘হাসপাতালের পাঁচটা সিঁড়ির মধ্যে চারটাই বন্ধ ছিল। লিফটও কার্যকর ছিল না। সিঁড়িগুলো চালু থাকলে এমন অবস্থা হতো না। এ জন্য আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই দায়ী মনে করি।’
‘রমজান আলী হাসপাতালে আগুন বা পদদলিত হওয়ার ঘটনায় মারা যাননি; তাঁকে বাইরে থেকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল’—হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন বক্তব্যের বিষয়ে সাইফুল বলেন, ‘হাসপাতালের রেজিস্টার চেক করলেই তো দেখা যাবে। আমাদের হাতে ৭টা ২৫ মিনিটে দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট ও গেট পাস আছে। তাহলে কীভাবে বলে, তিনি হাসপাতালে মারা যাননি?’
কী আছে হাসপাতালে রেজিস্টারে
গতকাল বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালটির ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগে। এতে লিফটের বাইরের আবরণ পুড়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। আগুন লাগার পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনদের অনেকে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে আহত হন। এ ঘটনায় চারজনের মৃত্যুর দাবি ওঠে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন তা নাকচ করেছে।
হাসপাতালে গতকালের অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের তথ্যসংবলিত একটি রেজিস্টারের পাতার ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া হতাহত ব্যক্তিদের তথ্যের সঙ্গে ওই রেজিস্টারের তথ্যের মিল আছে। এটি হাসপাতালের বলে নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান।
একজন নার্স তাৎক্ষণিক এই তালিকাভুক্তি করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্য নেই। তাঁদের শরীরে এমন কোনো চিহ্নও ছিল না।মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন)
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, আগুনের ঘটনার পর চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে দুজন ফুলবাড়িয়ার, একজন তারাকান্দার।
ওই দুর্ঘটনার পর মৃত পূর্বধলা উপজেলার ১০ নম্বর নারান্দিয়া ইউনিয়নের ভূগী গ্রামের আইয়ুব আলীর স্ত্রী হাজেরা বেগমের (৫০) বিষয়টি এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নথিতে থাকা চারজনের মৃত্যুর বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, একজন নার্স তাৎক্ষণিক এই তালিকাভুক্তি করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্য নেই। তাঁদের শরীরে এমন কোনো চিহ্নও ছিল না।