বদলে যাবে ঝিনাইদহ

আগা খান পুরস্কারজয়ী আগামীর ঝিনাইদহের নকশা হাতে স্থপতি খোন্দকার হাসিবুল কবির ও সুহায়লী ফারজানা।
ছবি: প্রথম আলো

বছর ৮-৯ আগের কথা। তরুণ স্থপতি খোন্দকার হাসিবুল কবির লক্ষ করেন, নিজ শহর ঝিনাইদহ দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাসিন্দারা ময়লা ফেলছেন অলিগলিতে। সরু হচ্ছে রাস্তাগুলো। যত্রতত্র রিকশা-ভ্যান আর ইজিবাইকে শহরে তীব্র যানজট। বিনোদনের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। রয়েছে আবাসনের সংকট। ৩২ দশমিক ৪২ বর্গকিলোমিটারের পৌরসভার মধ্য দিয়েই বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা নদীও হারাতে বসেছে জৌলুশ।

এ অবস্থায় শহরটি কীভাবে বাসযোগ্য করা যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করলেন হাসিবুল কবির, ২০১৫ সালে। সঙ্গী হলেন তাঁর স্থপতি স্ত্রী সুহায়লী ফারজানা। তাঁরা এ কাজে যুক্ত করলেন পৌরসভার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে। নিলেন সবার মতামত। একপর্যায়ে যুক্ত হলেন বাইরের স্থপতিরাও।

এভাবে তৈরি করলেন আগামীর ঝিনাইদহের নকশা। এতে রইল নবগঙ্গা নদীর পাড় ব্যবহার করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি, পায়ে হাঁটার পথ, বাগান, নাগরিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার সুবিধাসহ বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার আয়োজন। ‘আরবান রিভার স্পেসেস’ নামের এই নকশাই জিতে নিল মর্যাদাবান আগা খান পুরস্কার।

দ্য আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার সমসাময়িক স্থাপত্যশিল্পের জন্য সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার। মুসলমান-অধ্যুষিত সমাজে নির্মিত আধুনিক পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার এটি। চতুর্থ আগা খান ১৯৭৭ সালে স্থাপত্য বিষয়ে এই পুরস্কার প্রবর্তন করেন। পুরস্কারের মূল্যমান ১০ লাখ ডলার।

তিন বছর পরপর এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০২০-২২ সালের পুরস্কারপ্রাপ্ত ছয়টি প্রকল্পের মধ্যে বাংলাদেশের দুটি স্থাপত্য প্রকল্প রয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে ‘কমিউনিটি স্পেস’-এর জন্য স্থপতি রিজভী হাসান, খাজা ফাতমি, সাদ বিন মোস্তফা অপর পুরস্কারটি পেয়েছেন। অক্টোবর মাসে ওমানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

হাসিবুল কবির ও সুহায়লী ফারজানার প্রতিষ্ঠান কো.ক্রিয়েশন.আর্কিটেক্টসের করা এই নকশার একটি অংশ এরই মধ্যে ঝিনাইদহ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করেছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে দেবদারু অ্যাভিনিউ। এটি বাস্তবায়ন করেন তৎকালীন পৌর মেয়র সাইদুল করিম, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার বিনোদনপ্রেমী এসে বসছেন। স্থানটি জেলা শহরের একটি বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন

নকশায় ‘নদী ও পুকুরের দিকে করি মুখ, বাড়িয়ে দিই ঝিনেদার সুখ’—এই ধারণা নিয়ে জলবাগান, কমিউনিটি ঘাট, মুক্তমঞ্চ, পায়ে হাঁটার পথসহ নানা স্থাপনা রাখা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে বাঁচবে নদী, বাঁচবে শহর। এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ‘আগা খান’ পুরস্কার ছাড়াও পেয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব আর্কিটেক্ট-২০২২ অ্যাওয়ার্ড।

হাসিবুল কবির ঝিনাইদহ সদরের ভুটিয়ারগাতি গ্রামের খোন্দকার সাখাওয়াৎ হোসেন ও সৈয়দা হামিদা বেগমের পুত্র। বর্তমানে তাঁরা শহরের কবি সুকান্ত সড়কে বসবাস করেন। তিনি ঢাকার মো. সিরাজুল ইসলাম ও নাসিমা আফরোজ চৌধুরীর কন্যা সুহায়লী ফারজানাকে বিয়ে করেন। খোন্দকার সাহলান সাহির নামের ২০ মাসের এক পুত্রসন্তান রয়েছে তাঁদের। হাসিবুল কবির স্থাপত্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক ও পরে শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। তাঁর স্ত্রী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক ও উন্নয়ন অধ্যয়নে স্নাতকোত্তর করেছেন।

বড় পুরস্কার বিজয়ী হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় সুহায়লী ফারজানা বলেন, ‘আমরা সবাই যেন অপেক্ষায় আছি, কেউ এসে আমাদের শহর গুছিয়ে দেবে, সমাধান করে দেবে বাড়তে থাকা সমস্যাগুলোর। কিন্তু শহরের মানুষেরাই পারে নিজেদের শহর গোছাতে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে পেশাজীবীরা পারেন জনমুখী পরিকল্পনা করতে।’ সেই চিন্তা থেকে তাঁরা কাজটি শুরু করেছিলেন। এখন এটি বাস্তবায়ন হোক, এটাই প্রত্যাশা।

হাসিবুল কবির বলেন, নকশাটি বাস্তবায়িত হলে ঝিনাইদহ শহর বাসযোগ্য ও সুন্দর শহরে পরিণত হবে। তাঁরা দুজনই মনে করেন, এই পুরস্কার তাঁদের কাজের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

পুরস্কারটি কাজের সঙ্গে যুক্ত সবার। শুরু থেকেই তাঁদের উৎসাহিত ও সহযোগিতা করার জন্য ঝিনাইদহ পৌরসভার সাবেক মেয়র সাইদুল করিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তাঁরা।